ইএসওএইচআরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৯ জন সৌদি নাগরিক। বাকি ৫৯ জন বিভিন্ন দেশের নাগরিক। বাংলাদেশ ছাড়াও এ তালিকায় রয়েছেন ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তানের নাগরিকেরা।
সম্প্রতি মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে ইএসওএইচআরের প্রকাশিত প্রথম ছয় মাসের ১০৮ জনের পরিসংখ্যানে ওই দুই বাংলাদেশি অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড
ইএসওএইচআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রধান কারণ ছিল মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ। এ ধরনের মামলায় ৭১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ। হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ২৫ জনের। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট মামলায় ৯ জন এবং অন্যান্য অপরাধে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ৭১ জনের মধ্যে ৪৯ জনই বিদেশি নাগরিক। অর্থাৎ, এই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ অন্য দেশের নাগরিক। বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে কোন দেশের কতজন রয়েছেন, সে বিষয়ে মূল প্রতিবেদনে পূর্ণাঙ্গ দেশভিত্তিক বিভাজন দেওয়া হয়নি।
মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই সংখ্যা সৌদি আরবে মাদকবিরোধী কঠোর আইন প্রয়োগের বিষয়টি সামনে এনেছে। দেশটিতে মাদক পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এসব মামলায় মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার এবং বিদেশি নাগরিকদের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
সৌদির বর্তমান শাসনামলে মৃত্যুদণ্ড দুই হাজারে
ইএসওএইচআরের দাবি, সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে চলতি বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত দেশটিতে মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা দুই হাজারে পৌঁছেছে। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, সৌদি আরবের আগের শাসনামলগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা সর্বোচ্চ।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তথ্য প্রকাশের ঘাটতিকেও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে নথিভুক্ত ১০৮টি ঘটনার মধ্যে ৯১টির বিষয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ইএসওএইচআর বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো সংস্থা তথ্য জানতে পারেনি। অর্থাৎ, মোট ঘটনার ৮৪ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে আগাম তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাটির মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ না হলে বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, বন্দীদের আইনি অধিকার যাচাই এবং সম্ভাব্য অন্যায়ের বিষয়ে উদ্বেগ জানানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট মামলাতেও মৃত্যুদণ্ড
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কয়েকটি ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি উল্লেখ করেছে ইএসওএইচআর। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর আটকাদেশকে জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ আগে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে বিবেচনা করেছিল।
এ ছাড়া আলী আল-সুবাইতির মৃত্যুদণ্ড গত ৯ এপ্রিল কার্যকর করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের মধ্যে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও ছিল। শৈশবে সংঘটিত কথিত অপরাধের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের সম্পর্ক নিয়ে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবাধিকার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সংস্থাটির দাবি, শৈশবে সংঘটিত কথিত অপরাধের জন্য অন্তত পাঁচজন এখনো সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকির নামও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
বিচারপ্রক্রিয়া ও বন্দীদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা বন্দীদের আইনি সহায়তা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ইএসওএইচআর। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক বন্দী পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা, পেশাদার দোভাষী এবং কার্যকরভাবে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
কয়েকজন বন্দীর ভাষ্য উদ্ধৃত করে সংস্থাটি জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় এবং বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা প্রতিটি মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নথি এখানে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বতন্ত্র যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার, বিদেশি নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে এসব তথ্য সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিদেশি শ্রমিক ও প্রবাসীদের ক্ষেত্রে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইএসওএইচআরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা কমানো, বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সংস্থাটির প্রকাশিত পরিসংখ্যান ও অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ নথি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।