চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে কসাই নুর মোহাম্মদকে শ্বাসরোধে হত্যার মামলায় সুজন সরকারকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) চাঁদপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ সামছুন্নাহার এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি সুজন সরকার আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, নিহত নুর মোহাম্মদ (৪২) চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন ক্লাব রোড এলাকার প্রয়াত নুরুল ইসলামের ছেলে। পেশায় তিনি ছিলেন কসাই। বড় স্টেশন এলাকায় গরু জবাই ও মাংস বিক্রি করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন।
অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত সুজন সরকার (৩৫) মতলব দক্ষিণ উপজেলার উপাদী দক্ষিণ ইউনিয়নের উত্তর ঘোড়াধারী গ্রামের সরকার বাড়ির সুদর্শন আইচ্চাইল্লা সরকারের ছেলে। তিনি পেশায় জেলে ছিলেন এবং বড় স্টেশন এলাকায় মাছের ব্যবসা করতেন। ব্যবসার সূত্রেই নুর মোহাম্মদের সঙ্গে তার পরিচয় এবং পরবর্তী সময়ে আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক তৈরি হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ওই আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করেই দুজনের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সুজন সরকার নুর মোহাম্মদকে নিজের বাড়িতে ডেকে নেন। সেখানে পরিকল্পিতভাবে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। পরে মরদেহটি মতলব দক্ষিণের ঘোড়াধারী গ্রামের বিলের বাড়ির পশ্চিম পাশে ইউনুছ তালুকদারের একটি খালি জমিতে ফেলে রাখা হয়।
২০১৬ সালের ২ মার্চ রাতে ওই জমিতে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় গ্রাম পুলিশ নিমাই দাস। তিনি বিষয়টি ইউপি সদস্য মো. জাকির হোসেনকে জানান। পরে ইউপি সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান এবং পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে মতলব দক্ষিণ থানার পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
পরদিন, ৩ মার্চ ইউপি সদস্য মো. জাকির হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মতলব দক্ষিণ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। শুরুতে নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত না হলেও তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য বেরিয়ে আসে।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ সুজন সরকারকে গ্রেপ্তার করে। পরে ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। মামলার তদন্ত শেষে তৎকালীন মতলব দক্ষিণ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তপন চন্দ্র দাস ২০১৭ সালের ২৫ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
এরপর শুরু হয় বিচারিক প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের বক্তব্য, মামলার নথিপত্র এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) কোহিনুর রশিদ বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম চলেছে। এ সময়ে ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং আসামির অপরাধ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আদালত সুজন সরকারকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
রায়ের পাশাপাশি আদালত আসামিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করেছেন। জরিমানার অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে বিধান অনুযায়ী আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাকে।
দীর্ঘ সময় পর মামলার রায় হওয়ায় নিহত নুর মোহাম্মদের পরিবার ন্যায়বিচারের একটি পর্ব পেল। ২০১৬ সালে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে যে মামলার সূচনা হয়েছিল, প্রায় এক দশকের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার সেই মামলায় দণ্ড ঘোষণা করা হলো।