সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন ও ভাতার কাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ নামে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে নতুন বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর হবে না। বর্ধিত বেতন ও সংশ্লিষ্ট অর্থ তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বেতনবৃদ্ধির পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৭৫ শতাংশ কার্যকর করা হবে।
তৃতীয় ও শেষ ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিসহ (ইনক্রিমেন্ট) শতভাগ মূল বেতন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপনে ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। ১ম গ্রেডে নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন শুরু হবে ২০ হাজার টাকা থেকে।
নতুন স্কেলে গ্রেডভিত্তিক মূল বেতন হলো—
বিশেষ পদমর্যাদায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মূল বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিনিয়র সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের মূল বেতন হবে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হার কর্মস্থল ও গ্রেড অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া পাবেন। ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে এ হার ৫০ শতাংশ, ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৪র্থ গ্রেডে ৪০ শতাংশ।
অন্যান্য সিটি করপোরেশন, জেলা সদর, উপজেলা ও অন্যান্য এলাকার জন্যও আলাদা হারে বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি বাসায় বসবাসরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়িভাড়া ভাতা পাবেন না।
চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও বয়সভিত্তিক নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মাসে ৩ হাজার টাকা, ৫০ বছর ১ দিন থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা, ৬০ বছর ১ দিন থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হবে।
সন্তানদের জন্য শিক্ষা সহায়ক ভাতা হিসেবে সন্তানপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা পাওয়া যাবে। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মাসে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত এ সুবিধা দেওয়া হবে। নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী সন্তানের বয়স ২৩ বছর পর্যন্ত এ ভাতা প্রযোজ্য হবে।
সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা মাসে ৬০০ টাকা যাতায়াত ভাতা এবং ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা পাবেন। মোবাইল ভাতার ক্ষেত্রে ৫ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা ১৫০ টাকা পাবেন।
পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের জন্য মূল বেতনের ২০ শতাংশ অথবা নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমায় পাহাড়ি ভাতা রাখা হয়েছে। হাওর, দ্বীপ, চর ও অন্যান্য দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালনকারীদের জন্যও বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় সব কর্মকর্তা-কর্মচারী মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে নববর্ষ ভাতা পাবেন। নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা কার্যভার ভাতাও দেওয়া হবে।
আপ্যায়ন ভাতার ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মাসে ২ হাজার টাকা, সিনিয়র সচিব ও সচিব ১ হাজার টাকা, অতিরিক্ত সচিব ৯০০ টাকা এবং যুগ্মসচিব ও অন্যান্য প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তারা ৬০০ টাকা পাবেন।
নতুন বেতন আদেশে অবসরভোগী এবং আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্যও নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে বিদ্যমান নিট পেনশনের ভিত্তিতে নতুন নিট পেনশন নির্ধারণ করা হবে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনের স্ল্যাব রাখা হয়েছে।
পেনশনের বর্ধিত অংশও তিন ধাপে কার্যকর হবে এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে তা শতভাগ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে পেনশন ও গ্র্যাচুইটির বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত থাকবে।
পদোন্নতি ছাড়া একই পদে টানা আট বছর সন্তোষজনকভাবে চাকরি পূর্ণ করলে একজন স্থায়ী কর্মচারী নবম বছরে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এরপর আরও ছয় বছর চাকরি পূর্ণ হলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে পুরো চাকরিজীবনে একজন কর্মচারী সর্বোচ্চ দুটি উচ্চতর গ্রেড পেতে পারবেন।
তবে নতুন বেতন কাঠামো সব সরকারি চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস, প্রতিরক্ষা সার্ভিসের সামরিক পদ, পুলিশ বাহিনী, বিজিবি, দৈনিক বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মীরা এই বেতন কাঠামোর আওতার বাইরে থাকবেন।