বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট উপপরিদর্শক (এসআই)-২০২৬ ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দল। তাঁর ভাষ্য, গণঅভ্যুত্থানের মুখে দলটির নেতারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এত মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ ওঠার পরও দলটির পক্ষ থেকে যথাযথ ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। এত মানুষের প্রাণহানির পরও দলটির অবস্থান জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এসব প্রাণহানি ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।
কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত পুলিশ সার্জেন্ট ও সাব-ইন্সপেক্টরদের সততা, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে পুলিশ সদস্যদের ভয়ভীতি, প্রভাব ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হবে।
সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আইনি সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পুলিশকে এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে নির্ভয়ে তাদের কাছে যেতে পারেন। জনগণের পাশে থেকে সেবা দেওয়ার মাধ্যমেই পুলিশকে প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার বিষয়েও পুলিশ সদস্যদের সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জনবল বৃদ্ধি এবং যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের বিভিন্ন পদে নিয়োগ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে পুলিশ সুপার (এসপি), সাব-ইন্সপেক্টর, অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর (এএসআই) ও কনস্টেবল পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধী শনাক্ত করা, আসামি গ্রেপ্তার, তদন্ত পরিচালনা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য পুলিশ কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে দু-একটি ব্যতিক্রম থাকতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং অপরাধ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদের দাবি, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বোমা হামলা কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনায় ময়নাতদন্ত চলছে। পাশাপাশি প্রাথমিক তদন্তও করা হবে।
তদন্তের অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি। তুরাগ নদ থেকে নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তদন্তের আগে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য না করে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচন পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেখানে সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ চলছে এবং দুপুর পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তাঁর কাছে পাঠানো প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছিল।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখা এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। ভোটাররা যাতে স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি হতে পারে—এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামগ্রিকভাবে সেখানে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রয়েছে। যদিও মাঝেমধ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, তবে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনাবাহিনী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করা হয়।
নাটোরে ছাত্রদলের এক নেতাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হবে না। এমনকি সংসদ সদস্যের সন্তান হলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পান, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।
বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে অনুষ্ঠিত সমাপনী কুচকাওয়াজে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের ৮৪ জন এবং ৪৩তম ক্যাডেট এসআই ব্যাচের ১৬২ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন। সব মিলিয়ে দুই ব্যাচের ২৪৬ জন প্রশিক্ষণার্থী তাঁদের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কুচকাওয়াজের অভিবাদন গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণের বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী আটজন প্রশিক্ষণার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি।
এ সময় বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এবং পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।
প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষানবিশ সার্জেন্টরা নিজ নিজ ইউনিটে যোগ দেবেন। অন্যদিকে, ক্যাডেট এসআই ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থীরা শিক্ষানবিশ এসআই (নিরস্ত্র) হিসেবে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন এই পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, মানবিক আচরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাঁদের কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে। একই সঙ্গে অপরাধ দমন এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও তাঁদের দায়িত্বের কেন্দ্রে থাকবে।