বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জাপানের টোকিওতে হোটেল নিউ ওতানিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ কমিউনিটি আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে তিনি সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং প্রবাসীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন।
তারেক রহমান বলেন, টোকিওর রাস্তাঘাটে সাধারণত ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায় না। অথচ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য জমে থাকতে দেখা যায়, যা নগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু শহরের সৌন্দর্য বাড়ানোর বিষয় নয়, এর সঙ্গে মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার বিষয়টিও সরাসরি জড়িত।
তিনি বলেন, যেখানে-সেখানে আবর্জনা জমে থাকলে জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন করতে হলে রাস্তাঘাটে বর্জ্য জমে থাকা বন্ধ করার পাশাপাশি বায়ুদূষণ কমানো এবং সবুজায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। গাছ লাগানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, রাস্তায় আবর্জনার কারণে মানুষের চলাচলে যেন ভোগান্তি না হয় এবং দূষিত বাতাসের কারণে মানুষকে যেন অসুস্থ হতে না হয়, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঢাকাকে টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন শহরে পরিণত করা সম্ভব হলে তা দেশের নগর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার হবে।
পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য সংস্কার কার্যক্রমের সুফল সমাজের প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উন্নয়নে এমন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যার সুফল সাধারণ মানুষ সরাসরি ভোগ করতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি এমন সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে চান, যা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করবে। শুধু সীমিতসংখ্যক মানুষের উপকার হয়, এমন উদ্যোগের পরিবর্তে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যাতে লাভবান হন, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তারেক রহমান অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের উপকারে আসবে—এমন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিএনপি সরকারকে বাধাগ্রস্ত করার পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে এমন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা।
এসব উদ্যোগ সফল করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের গণতন্ত্রমনা মানুষের সমর্থন পেলে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীদের পরিবারসহ দেশের সাধারণ মানুষও এর সুফল পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এ কারণে উদ্যোগগুলোর যৌক্তিকতা বিবেচনা করে সেগুলোর পক্ষে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি বলছি না যে বিএনপিকে ভোট দেন। কাজগুলো যদি আপনাদের কাছে সঠিক মনে হয়, তাহলে সমর্থন দেন, যাতে আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি।’
তার এ বক্তব্যের সময় উপস্থিত প্রবাসীরা করতালি দিয়ে সমর্থন জানান।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কিছু সংস্কারের সুফল সীমিতসংখ্যক মানুষ পেতে পারেন। তবে তাঁর অগ্রাধিকার এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা, যার মাধ্যমে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। এ ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়নে পরিশ্রম, ধৈর্য ও পারস্পরিক ঐক্য প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রবাসীদের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে বিভিন্ন খাতে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি শিশুদের জাপানি ভাষা শেখানো, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা বিকাশের বিষয়ে কথা বলেন।
এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা, দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করা এবং মানুষের জন্য আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করা।
জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা বিদেশের কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, তা দেশের উন্নয়নেও কাজে লাগতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রবাসীদের সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—মতবিনিময় অনুষ্ঠানে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে এসব পরিকল্পনাও ছিল।
ঢাকার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ, নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা, নিয়মিত অপসারণ এবং নাগরিক সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ কমানো ও বৃক্ষরোপণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনা কত দ্রুত এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে কার্যকর উদ্যোগ ও ধারাবাহিক তদারকির ওপর।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীরা।
অনুষ্ঠানে জাপান বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে আলোকচিত্র উপহার দেওয়া হয়।
প্রবাসীদের সঙ্গে এ মতবিনিময়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। ঢাকাকে টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন শহরে রূপান্তরের যে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন, তা বাস্তবায়নে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।