রাজধানীর প্রবেশপথ সাভারের আমিনবাজারে গাড়ি পার্কিং ও সাইড দেওয়া-নেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের জেরে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক উপপরিদর্শক (এসআই) নিহত হয়েছেন। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন তাঁর ২৬ বছর বয়সী ছেলে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে জহিরুল ইসলাম (৩২) নামে এক প্রাইভেটকারচালককে গ্রেপ্তার করেছে।
নিহত মো. আলতাব হোসেনের বয়স ৬০ বছর। তিনি এসবির ঢাকার মালিবাগ কার্যালয়ে উপপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার সাধুপাড়া গ্রামে। তিনি প্রয়াত জুরাইন আলী শেখের ছেলে। চাকরির পাশাপাশি পরিবার নিয়ে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
ওই এলাকায় পাঁচ শতাংশ জমিতে টিনশেডের একটি কারখানা গড়ে তুলে সেখানে মিনি গার্মেন্টস পরিচালনা করতেন আলতাব হোসেন। শনিবার রাতে সেই কারখানার কাছেই ঘটে হামলার ঘটনা।
নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ৮টার দিকে আলতাব হোসেন তাঁর কারখানার পাশের একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে কয়েকজন যুবককে গ্যারেজ মালিক আবুল কালামকে মারধর করতে দেখেন। অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের সাইড দেওয়া-নেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই মারধরের ঘটনা ঘটছিল বলে জানা যায়।
বিষয়টি দেখে আলতাব সেখানে এগিয়ে যান এবং কেন আবুল কালামকে মারধর করা হচ্ছে, তা জানতে চান। এ সময় হামলাকারীরা তাঁর পরিচয় জানতে চায়। আলতাব নিজেকে পুলিশের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও তাঁকে ছাড় দেওয়া হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।
একপর্যায়ে কানে আঘাত পেয়ে আলতাব দৌড়ে নিজের কারখানায় চলে যান। বাবার সঙ্গে কী হয়েছে জানতে পেরে তাঁর ছোট ছেলে মো. আরিফুল ইসলামও কারখানার বাইরে বেরিয়ে আসেন।
পরিবারের অভিযোগ, কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেটকার এসে তাঁদের কারখানার সামনে থামে। গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে আরও ২০ থেকে ২৫ জন সেখানে জড়ো হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুল কারখানার ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
তবে হামলাকারীরা ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। তাদের ভাষ্য, আলাউদ্দিন নামে একজন প্রথমে আরিফুলকে মাটিতে ফেলে তাঁর বুকে লাথি মারেন। পরে পেছন থেকে ভারী কোনো বস্তু দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করা হলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
একই সময় আলতাব হোসেনকেও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। হামলাকারীরা কারখানায় ঢুকে মেশিনপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করেছে বলেও দাবি করেছে নিহতের পরিবার।
হামলার খবর পেয়ে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয়রা আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুলকে উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলতাব হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
আরিফুল ইসলাম গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
আলতাব হোসেনের বড় ছেলে শরিফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তাঁদের কারখানার পাশের একটি জায়গায় বালু ফেলে মাঠের মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। তাঁর বাবার ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম জানান, গাড়ি পার্কিংকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ঝামেলার সূত্রপাত হয়। বিষয়টি মীমাংসা করতে গিয়ে এসবির সদস্য আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলে হামলার শিকার হন।
ওসি জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় আলতাব হোসেনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
মামলার পর অভিযান চালিয়ে জহিরুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের ছেলে এবং পেশায় প্রাইভেটকারচালক। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে থানা পুলিশ।
গাড়ি পার্কিংয়ের মতো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী হামলায় রূপ নিল, তা এখন তদন্তের বিষয়। একই সঙ্গে হামলায় কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং ঘটনাটির পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।