টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বিপুল পরিমাণ ওষুধ নিয়ে যমুনা নদীতে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার রাত প্রায় ১১টার দিকে ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী এলাকায় নদীর ঘাটে একটি মিনি ট্রাকে করে এসব ওষুধ নেওয়া হলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে স্থানীয়রা ট্রাকটি আটকে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ গিয়ে ওষুধসহ ট্রাক ও চালককে হেফাজতে নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের বেলায় গোবিন্দাসী যমুনা ঘাটে একটি মিনি ট্রাক আসতে দেখে তাঁদের সন্দেহ হয়। ঘাটে সাধারণত এমন সময়ে পণ্যবাহী ট্রাকের আনাগোনা না থাকায় কয়েকজন ট্রাকটির কাছে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, গাড়িটি বস্তাভর্তি বিপুল পরিমাণ ওষুধে ঠাসা। এরপর ট্রাক থেকে ওষুধগুলো নদীতে ফেলার প্রস্তুতি চলছে বলে তাঁদের ধারণা হয়। বিষয়টি জানানো হয় পুলিশকে।
খবর পেয়ে ভূঞাপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাক ও ওষুধগুলো নিজেদের হেফাজতে নেয়। ট্রাকচালক আজমত আলীকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়।
চালক আজমত আলী পুলিশকে জানান, বাবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে গোবিন্দাসী এলাকায় কিছু বস্তা নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর ট্রাক ভাড়া করেছিলেন। বস্তার ভেতরে কী ছিল, সে সম্পর্কে তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয়দের ধারণা, উদ্ধার হওয়া ওষুধের একটি অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে থাকতে পারে। হাসপাতালে রোগীদের মধ্যে সময়মতো বিতরণ না হওয়ায় এসব ওষুধ পরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। তবে ওষুধগুলো কেন হাসপাতাল থেকে বের করা হয়েছিল এবং সেগুলো নদীতে ফেলার পরিকল্পনা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই হাসপাতালের ওষুধ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঘাটাইল উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সালাম খান আওয়াল তাঁর ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতালে রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ না দিয়ে অনেক সময় বাইরে থেকে কিনতে বলা হয়, অথচ বিপুল পরিমাণ ওষুধ পরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
রেবেকা সুলতানা সেতু নামের আরেক ব্যক্তি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফেসবুকে এমন আরও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের ঝটিকা পরিদর্শনের কথা ছিল হাসপাতালে। তাঁদের ধারণা, পরিদর্শনের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরিয়ে ফেলার অংশ হিসেবেই সেগুলো হাসপাতাল থেকে বের করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এই তথ্যের আনুষ্ঠানিক সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নয়িম মোহাম্মদ সোহেল হাসপাতালের গাফিলতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম বলেন, স্থানীয়দের হাতে আটক হওয়া পিকআপভর্তি ওষুধ এবং চালককে থানার হেফাজতে রাখা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
সরকারি হাসপাতালের ওষুধ সাধারণত নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংরক্ষণ, বিতরণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ হলে নিষ্পত্তি করার কথা। সেসব ওষুধ যদি সত্যিই নদীতে ফেলার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক গাফিলতির প্রশ্ন নয়, পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে নদীতে ওষুধ বা চিকিৎসাসামগ্রী ফেলে দিলে পানিদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন হলো—উদ্ধার হওয়া ওষুধগুলোর কতগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ, সেগুলো হাসপাতাল থেকে কেন সরানো হয়েছিল, কার নির্দেশে ট্রাকে তোলা হয়েছিল এবং নদীতে ফেলার পরিকল্পনার সঙ্গে কারা জড়িত। তদন্ত শেষ হলে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।