নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার আশায় অভিভাবকেরা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেই যদি শিশুরা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, তাহলে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বাংলাদেশে মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় অন্তত ১০৯ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অন্তত ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১৭১। তাদের মধ্যে ১৬১ জন ধর্ষণের শিকার এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর বড় অংশই ঘটেছে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে। তবে এসব পরিসংখ্যানের বাইরে আরও ঘটনা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয় ও পারিবারিক চাপের কারণে অনেক অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে না।
শিশুদের নিরাপত্তা ও বিচারপ্রাপ্তির সংকটের একটি উদাহরণ রাজধানীর বনশরীর একটি মাদ্রাসায় ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর মৃত্যু। চলতি বছরের মে মাসে ওই মাদ্রাসা থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে শিশুটির মা মামলা করেন। পরে একই মাদ্রাসার এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে মূল সংবাদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে দোষী বলা যায় না। কিন্তু একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, তা এ ঘটনা আবারও সামনে এনেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের বিচার নিশ্চিত করতে বড় বাধাগুলোর একটি হলো যথাযথভাবে প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় শিশুর শারীরিক পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুতের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মানসম্মত পরিচালন পদ্ধতি বা এসওপি নেই।
ফলে চিকিৎসা পরীক্ষা ও ডিএনএ বিশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ আলামত যথাযথভাবে সংগ্রহ এবং আদালতে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলামত সংগ্রহে ত্রুটি, সংরক্ষণে অসংগতি কিংবা পরীক্ষার ফলাফল যথাসময়ে না পাওয়ার কারণে মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুবান্ধব পরিবেশে পরীক্ষা, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ফরেনসিক প্রমাণ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও বড় বাধা। বিশেষ করে ছেলে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হলে অনেক পরিবার সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কায় বিষয়টি গোপন রাখতে চায়। কখনো শিশুকে চুপ থাকতে বলা হয়, আবার কখনো অভিযোগ জানালে আরও বিপদে পড়তে হবে—এমন ভয়ও কাজ করে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী শিশুরা শুধু ন্যায়বিচার থেকেই বঞ্চিত হয় না; প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও নিরাপদ পরিবেশ থেকেও দূরে থাকে। নির্যাতনের অভিজ্ঞতা শিশুর মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও অন্যদের প্রতি বিশ্বাসের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঘটনা গোপন না রেখে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে দোষারোপ না করে সহায়তা দেওয়া জরুরি।
অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও বুঝতে হবে, কোনো শিশু নির্যাতনের কথা জানালে তার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে। শিশুকে ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা তার অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলে সে ভবিষ্যতে সাহায্য চাইতে আরও দ্বিধায় পড়তে পারে।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শিশুদের বয়স উপযোগী ভাষায় ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে, যাতে তারা অনিরাপদ আচরণ শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত কারও কাছে সাহায্য চাইতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। শিশুদের সঙ্গে কীভাবে নিরাপদ ও সম্মানজনক আচরণ করতে হবে, নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেলে কী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং কীভাবে শিশুর পরিচয় ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ জানানোর জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর বা উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রাখা গেলে তারা ভয় ও দ্বিধা ছাড়াই সহায়তা চাইতে পারবে।
মাদ্রাসা বা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু অভিভাবকের নয়। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অভিযোগ উঠলে তা চাপা না দিয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, ভুক্তভোগীকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্ভাব্য সংস্পর্শ থেকে নিরাপদ রাখা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার দ্রুততর করতে চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো দরকার। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগাম দোষী ঘোষণা না করেও ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
জেএমবিএফের পরিসংখ্যানে উঠে আসা ১০৯ শিশুর ঘটনা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। শিশুদের নিরাপদে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রক্ষা করতে হলে সচেতনতা, কার্যকর প্রতিরোধ, নির্ভরযোগ্য অভিযোগ ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ বিচার—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন কোনো শিশুর জন্য ভয়ের জায়গা হয়ে না ওঠে, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান অগ্রাধিকার।