নেপালের ভোটেকোশি জেলায় আকস্মিক বন্যার পর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রবল পানির স্রোতে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মরদেহ উদ্ধারের স্থানও ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন জেলায়। একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় হাসপাতাল ও মর্গগুলোতে তৈরি হয়েছে তীব্র জায়গা সংকট। স্বজনেরা ছুটে বেড়াচ্ছেন এক জেলা থেকে অন্য জেলায়, প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্তের আশায়।
দেশটির পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৫৪৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গত বুধবার ভোটেকোশি নদীতে আকস্মিকভাবে প্রবল স্রোত সৃষ্টি হলে এই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়। পানির তোড়ে মানুষ ও স্থাপনার পাশাপাশি মরদেহও নদীর স্রোতে ভেসে যায় অনেক দূরে।
সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার মূল কেন্দ্র ভোটেকোশি হলেও বর্তমানে অধিকাংশ মরদেহ সেখান থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে না। নদীর প্রবল স্রোতে মরদেহগুলো ভেসে ভাটির বিভিন্ন জেলার দিকে চলে গেছে। ফলে দুর্গত এলাকার বাইরে থাকা জেলা ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলগুলোতেও একের পর এক মরদেহের সন্ধান মিলছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে মরদেহ সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্ত করা নিয়ে। বিভিন্ন জেলার হাসপাতাল ও মর্গে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি মরদেহ চলে আসায় সংশ্লিষ্টদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। জায়গার অভাবে কিছু মরদেহ পার্শ্ববর্তী জেলার মর্গেও পাঠানো হয়েছে।
রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার বাসিন্দাদের মরদেহ নদীর ভাটিতে চিতওয়ান, তানাহুন, নাওয়ালপারাসি ও আশপাশের এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে। নুয়াকোট, ধাদিং ও নাওয়ালপারাসির মর্গগুলোতে ইতোমধ্যে জায়গা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
চিতওয়ানের পরিস্থিতি আরও গুরুতর। সেখানকার হাসপাতালের মর্গে মরদেহ রাখার আর পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অস্থায়ী মর্গ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের নিয়মিত মর্গে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখা সম্ভব। নতুন অস্থায়ী মর্গে প্রায় ২৫০টি মরদেহ সংরক্ষণ করা যাবে।
এদিকে বিভিন্ন জেলা থেকে মরদেহ আসতে থাকায় পোখরার হাসপাতালের মর্গেও জায়গা দ্রুত কমে আসছে। ফলে বন্যার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পাশাপাশি দূরের জেলা ও হাসপাতালগুলোতেও পরিস্থিতির চাপ তৈরি হয়েছে।
চিতওয়ানে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ত্রিশূলি ও নারায়ণি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৩৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবারও সেখানে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিল সংশ্লিষ্ট দলগুলো। নদীর তীর, চর ও অন্যান্য সম্ভাব্য স্থানে মরদেহের সন্ধান করা হচ্ছে।
মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিতওয়ানে ছুটে আসছেন বন্যাকবলিত বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা। হাসপাতাল ও অস্থায়ী মর্গের সামনে অপেক্ষা করছেন স্বজনেরা। কারও হাতে প্রিয়জনের ছবি, কেউ অপেক্ষা করছেন পরিচয় শনাক্তের খবরের জন্য। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কোনো মরদেহ শনাক্ত হলে সেটি পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করছে কর্তৃপক্ষ।
তবে প্রবল বন্যার পানিতে মরদেহ অনেক দূরে ভেসে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জেলা থেকে মরদেহ আসায় সংরক্ষণ, শনাক্তকরণ ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ভোটেকোশির এই বন্যা শুধু প্রাণহানির সংখ্যাই বাড়াচ্ছে না, দুর্গত এলাকার বাইরেও তৈরি করছে নতুন মানবিক সংকট। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহ যখন একের পর এক ভাটির জেলায় পৌঁছাচ্ছে, তখন হাসপাতাল ও মর্গগুলোও সেই বিপুল চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আর প্রতিটি মরদেহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনো না কোনো পরিবারের শেষ আশাটুকু—স্বজনকে অন্তত শনাক্ত করে শেষবারের মতো কাছে পাওয়ার।