রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর-টঙ্গী সড়কে গভীর রাতে মোটরসাইকেলে দুই তরুণের মাঝখানে এক তরুণীকে নিথর অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ঘিরে যে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছিল, তার কিছুটা অবসান হয়েছে। আলোচিত সেই তরুণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনি ভালো আছেন এবং বেঁচে আছেন।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ফোনালাপে ওই তরুণী নিজের অবস্থার কথা জানান। তবে ঘটনার বিস্তারিত বলতে রাজি হননি তিনি। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন বলে ফোন রেখে দেন। জানা গেছে, শুরুতে ওই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেও তিনি আগ্রহী ছিলেন না।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ওই রাতে তরুণীর সঙ্গে থাকা দুই তরুণ কারা ছিলেন, কোথা থেকে তাকে মোটরসাইকেলে তোলা হয়েছিল, তার শারীরিক অবস্থা কী ছিল এবং তাকে কোথায় নেওয়া হচ্ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তরুণীর কয়েকজন স্বজনের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। তার বড় বোনের স্বামী জানিয়েছেন, ‘চুমকি’ ছদ্মনামে পরিচিত ওই তরুণী কখনো মদ্যপান করতেন না।
ওই স্বজনের ভাষ্য, ঘটনার দিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। বিষয়টি দেখে তরুণী রাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। পরে তিনি ওই দুই তরুণের সঙ্গে ছিলেন এবং সম্ভবত তাদের সঙ্গে মদ্যপান করেন। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই তরুণেরা তাকে বাসায় পৌঁছে দেন বলে দাবি করেছেন স্বজনটি।
তবে স্বজনের এই বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ যাচাই করছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর মোটরসাইকেলটির নম্বরপ্লেটের তথ্য ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়। বিভিন্ন সংস্থার সূত্রের বরাতে জানা যায়, মোটরসাইকেলটির মালিকের বাড়ি কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর এলাকায়।
মোটরসাইকেলটির সঙ্গে দুটি মোবাইল নম্বরের তথ্যও পাওয়া যায়। এর একটি নম্বরের শেষ তিন অঙ্ক ১৫২। নম্বরটি একজন শোরুম মালিকের বলে জানা গেছে। তবে ওই শোরুম মালিক দাবি করেছেন, তার শোরুম থেকে মোটরসাইকেলটি বিক্রি হয়নি। কীভাবে তার মোবাইল নম্বর মোটরসাইকেলটির তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হলো, সে বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
অন্য মোবাইল নম্বরটি দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মোটরসাইকেলটির মালিকের বাড়ি আব্দুল্লাহপুরে হলেও সেটি চালাচ্ছিলেন রাজেন্দ্রপুরের এক তরুণ। তার নামের শেষাংশে ‘আলম’ রয়েছে বলে জানা গেছে। ওই তরুণীর এর আগে দুটি বিয়ে হয়েছিল বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
ঘটনাটি ঘটে বুধবার (২৬ আগস্ট) গভীর রাতে। আনুমানিক রাত ৩টা ১৫ থেকে ৩টা ২০ মিনিটের মধ্যে আব্দুল্লাহপুর থেকে টঙ্গীর দিকে একটি মোটরসাইকেলে তিনজনকে যেতে দেখেন মুফতি মনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি।
ওমরাহ সফর শেষে বগুড়ায় ফেরার পথে তিনি আব্দুল্লাহপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ওই মোটরসাইকেলটিকে অনুসরণ করেন। তখন তার চোখে পড়ে, চালকের পেছনে বসা এক তরুণ একজন তরুণীকে জাপটে ধরে রেখেছেন।
তরুণীর দুই পা ছিল খালি। পা দুটি মোটরসাইকেলের দুই পাশে অস্বাভাবিকভাবে ঝুলছিল। পুরো দৃশ্যটি দেখে মুফতি মনোয়ারের সন্দেহ হয়, তরুণীটি হয়তো অচেতন অবস্থায় আছেন।
তার বর্ণনা অনুযায়ী, স্বাভাবিকভাবে সচেতন কোনো মানুষের পা এভাবে নিথর হয়ে ঝুলে থাকার কথা নয়। ফলে তরুণীটি জীবিত কি না, তা নিয়েও তার মনে শঙ্কা তৈরি হয়।
পরে ঘটনাটির বর্ণনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই ধারণা করতে থাকেন, তরুণী হয়তো কোনো অপরাধের শিকার হয়েছেন। আবার কেউ কেউ তাকে অচেতন অবস্থায় কোথাও নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে এখন ওই তরুণী নিজেই জানিয়েছেন, তিনি জীবিত এবং ভালো আছেন। ফলে ঘটনার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি আপাতত দূর হয়েছে। কিন্তু কী কারণে তাকে ওই অবস্থায় গভীর রাতে মোটরসাইকেলে বহন করা হচ্ছিল, সেটি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।
তরুণীর সন্ধান পাওয়ার পর তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে কয়েকটি প্রশ্ন। তিনি সেদিন রাতে কেন বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন এবং কীভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন—এসব বিষয় জানতে তার বিস্তারিত বক্তব্য প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মোটরসাইকেলে থাকা দুই তরুণের পরিচয় ও তাদের সঙ্গে ওই তরুণীর সম্পর্কও যাচাই করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলটির মালিকানা, মোবাইল নম্বর এবং চালকের পরিচয়সংক্রান্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোও তদন্তের অংশ হতে পারে।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য ও অনুমান ছড়িয়ে পড়লেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সেগুলোকে সত্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, তরুণী নিজেই জানিয়েছেন তিনি ভালো আছেন এবং পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে দেননি।
পুলিশের তদন্ত এবং তরুণীর বিস্তারিত বক্তব্য সামনে এলে আব্দুল্লাহপুর-টঙ্গী সড়কে সেই রহস্যময় রাতের ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল, তার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।