বগুড়ায় ঈদের চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী রাকিবুল হাসান হৃদয় (২৮) হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে পাঁচ আসামির প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বেলা পৌনে ১২টার দিকে বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতের বিচারক কৌশিক আহমেদ খোন্দকার এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও প্রমাণ বিবেচনায় নেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন বগুড়া সদর উপজেলার ধাওয়াপাড়া এলাকার টিয়া মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন স্বাধীন (২৩) এবং আসলামের ছেলে মো. রাব্বি (২৪)। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া তিনজন হলেন একই এলাকার মমতাজের ছেলে আশিক (২২), মনু মিয়ার ছেলে মো. শাকিল (২৩) এবং সাফির ছেলে মতিন (২৫)। আদালতের রায়ে প্রত্যেকের জন্য ৫০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশও দেওয়া হয়েছে।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২০ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বগুড়া সদর উপজেলার কৈপাড়া এলাকায় হৃদয়ের ভ্যারাইটি স্টোরে ওই পাঁচ আসামি যান। সেখানে তারা ঈদের চাঁদা দাবি করেন।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। একপর্যায়ে আসামিরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে দোকানে ঢুকে ব্যবসায়ী রাকিবুল হাসান হৃদয় এবং তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মামুনুর রশীদকে (৫৮) উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় বাবা ও ছেলেকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদয়ের মৃত্যু হয়। তার বাবা মামুনুর রশীদও ওই ঘটনায় আহত হন।
হৃদয়ের মৃত্যুর পর তার মা মোছা. আয়েশা সিদ্দিকা বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়।
পুলিশ তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত পাঁচ আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে সোমবার রায় ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট এস এম মাসুদুর রহমান স্বপন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে একজন তরুণ ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিয়েছেন। রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট বলেও জানান তিনি।
রায় ঘোষণার পর আদালতের বাইরে আবেগাপ্লুত হয়ে প্রতিক্রিয়া জানান মামলার বাদী ও নিহত হৃদয়ের মা আয়েশা সিদ্দিকা। ছেলের হত্যার বিচার পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
আয়েশা সিদ্দিকা জানান, তার একমাত্র ছেলে কোরআনের হাফেজ ছিলেন। ঈদের আগের দিন তাকে হত্যা করা হয়। হৃদয়ের মৃত্যুর পরের দিনই তার একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু জন্মের পর সেই শিশু আর কোনো দিন তার বাবাকে দেখার সুযোগ পায়নি।
ছেলের হত্যার বিচার দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন আয়েশা সিদ্দিকা। আদালতের রায়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর পরিবারের কাছে এ রায় গুরুত্বপূর্ণ।
চার বছর আগে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের মামলায় আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের আগে আইন অনুযায়ী পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয় রয়েছে।