পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় আইফোন কেনার জন্য নিজের দেড় বছরের শিশুপুত্রকে এক লাখ টাকায় লিখিতভাবে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক কাঠমিস্ত্রি বাবার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশ কাজ শুরু করেছে। শিশুটিকে নেওয়া ব্যক্তিকেও থানা হেফাজতে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের মাছুয়াখালী গ্রামের মুন্সিবাড়ি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে।
অভিযুক্ত বাবা মো. মারুফ ওই গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমকে বলেন, শিশুপুত্র মুসাকে নিয়ে বাজারে ঘুরতে যাবেন। এরপর শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও বাবা-ছেলে বাড়িতে ফেরেননি।
পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা জানতে পারেন, দশমিনা উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের রোমানাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে এক লাখ টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, আইফোন কেনার জন্যই ওই টাকা নেওয়া হয়।
মারুফের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি শিশুপুত্র মুসাকে ইমরান হোসেনের কাছে এক লাখ টাকার বিনিময়ে লিখিতভাবে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। শিশুটিকে দেওয়ার বিনিময়ে পাওয়া টাকা দিয়ে ঢাকায় গিয়ে পুরোনো আইফোনের বিনিময়ে নতুন আইফোন নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে ঘটনার পুরো বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করে দেখছে। শিশুটিকে কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে অন্য ব্যক্তির কাছে দেওয়া হয়েছে, সেই প্রক্রিয়ার বৈধতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে।
ঘটনার পর থেকে মারুফ পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
শিশুটির দাদি মাহফুজা বেগম বলেন, প্রায় চার বছর আগে মারুফ ঢাকার সাভার থেকে বৃষ্টি নামের এক তরুণীকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। প্রায় তিন বছর পর তাদের ঘরে মুসার জন্ম হয়।
দাদি জানান, প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিষয় নিয়ে মারুফ ও তার স্ত্রী বৃষ্টির মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এরপর বৃষ্টি বাবার বাড়িতে চলে যান। কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর মারুফও ঢাকায় চলে যান। গত শুক্রবার সন্ধ্যার আগে তিনি আবার বাড়িতে ফেরেন।
শনিবার সকালে নাতিকে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে মাহফুজা বেগম বলেন, মারুফ তাকে শিশুটিকে জামাকাপড় পরিয়ে দিতে বলেছিলেন। বাজারে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নাতিকে সঙ্গে নিয়ে বের হওয়ার পর সন্ধ্যা হয়ে গেলেও তারা ফেরেননি। পরে খোঁজাখুঁজি করে শিশুটিকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে দেওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান তিনি।
নাতিকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে মাহফুজা বেগম প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন।
শিশুটিকে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ইমরান হোসেনও। মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, মারুফ দীর্ঘদিন ধরে তার শিশুপুত্রকে তার কাছে দেওয়ার কথা বলে আসছিলেন।
ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, তার শ্বশুরের পাঁচ মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে সন্তান নেই। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে এক লাখ টাকার বিনিময়ে লিখিতভাবে মুসাকে নেওয়া হয়। পরে শনিবার বিকেলে শিশুটিকে তার শ্বশুরবাড়িতে দিয়ে আসেন তিনি।
তবে শিশুকে অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে দেওয়ার এই ঘটনার আইনগত বৈধতা কী, সে বিষয়ে পুলিশ তদন্তের পরই বিস্তারিত জানা যাবে।
দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জানার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে। শিশুটিকে যে ব্যক্তি নিয়েছেন, তাকে থানা হেফাজতে আনা হয়েছে।
ওসি বলেন, শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশ সরেজমিনে কাজ করছে। শিশুটিকে উদ্ধারের পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেড় বছরের একটি শিশুকে অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুটির নিরাপত্তা ও বর্তমান অবস্থান নিয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন। পুলিশ বলছে, শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিশুটিকে কেন এবং কীভাবে অন্যের কাছে দেওয়া হয়েছিল, টাকা লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন পুলিশের তদন্তেই নির্ধারিত হবে।