মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় বোরকা পরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে চার যুবকের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ বাজারে এ ঘটনা ঘটে। হামলার পর স্থানীয় লোকজনের ধাওয়া ও মারধরে তাইজুল সরদার (২৬) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন। তাঁদের মধ্যে দুই ভাই মহাসিন ও জহির চৌকিদারের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
নিহত তাইজুল সরদার মাদারীপুর সদর উপজেলার কুলপদ্দি এলাকার রুস্তম সরদারের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি আলীনগর ইউনিয়নের মানিক সরদার হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। প্রাথমিকভাবে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতার বিষয়টি সামনে এলেও ঘটনার পেছনের কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে কালিগঞ্জ বাজারে হানিফের চায়ের দোকানের সামনে একটি অটোরিকশা থেকে বোরকা পরা চার যুবক নামেন। এরপর তাঁরা পরপর তিনটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটান। বিস্ফোরণের পরপরই সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মিলন সরদার এবং মহাসিন ও জহির চৌকিদারের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হন এবং বাজার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় দফাদার ও বাজার কমিটির সভাপতি ফিরোজ সরদার জানান, বোরকা পরা চারজনকে দেখে প্রথমে তাঁদের নারী ও ভিক্ষুক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু অটোরিকশা থেকে নেমেই তাঁরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বোমা বিস্ফোরণের পর প্রচুর ধোঁয়া তৈরি হয় এবং চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। এরপর হামলাকারীরা জহির চৌকিদারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকেন।
জহিরকে রক্ষা করতে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মিলন সরদার এগিয়ে গেলে তাঁর শরীরেও রক্ত লাগে বলে জানান ফিরোজ সরদার। পরে মহাসিন চৌকিদারের ওপরও হামলা চালানো হয়। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্থানীয় লোকজন হামলাকারীদের ধাওয়া করেন। তিনজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাইজুলকে আটক করেন স্থানীয়রা।
পরে গণপিটুনিতে তাইজুল গুরুতর আহত হন। তাঁকে প্রথমে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে হামলার পর তাঁকে কী পরিস্থিতিতে আটক করা হয়েছিল এবং মারধরের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হামলায় আহত মহাসিন ও জহির আপন দুই ভাই। তাঁদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে জহিরের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অন্য আহতদের পরিচয় ও শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাহাঙ্গীর আলম জানান, বৃহস্পতিবার সকালে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মিলন সরদার তাঁর লোকজন নিয়ে কালিগঞ্জ বাজারের হানিফের চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন। এ সময় বোরকা পরিহিত চারজন তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। হামলাকারীদের মধ্যে নিহত তাইজুল, সাইফুল ও আলামিন—এই তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মহাসিন ও জহিরের সঙ্গে তাইজুলের হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে তাইজুল পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন তাঁকে ধাওয়া করে আটক করেন এবং মারধর করেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং পূর্বশত্রুতার জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
এদিকে কালিগঞ্জ বাজার ও আশপাশের এলাকায় কয়েক দিন ধরে বাইরের এলাকা থেকে আসা কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বোমা বিস্ফোরণ, ধারালো অস্ত্রের হামলা এবং পরবর্তী গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুরো ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে পুলিশের তদন্তের দিকেই এখন নজর স্থানীয়দের।