কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। মামলার এক আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মোবাইল ফোনে একের পর এক কল আসাকে কেন্দ্র করে তদন্ত নতুন মোড় নেয়। সেই সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইফোন নেওয়ার পাশাপাশি অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নেওয়া নিয়ে বিরোধও হত্যার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে এসব তথ্য জানান বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা হত্যা মামলায় তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তখনও পুলিশ জানত না অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের সংবাদ পাওয়া যায়।
জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। তবে রাতে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। যদিও অন্যদের নাম প্রকাশে সে রাজি হচ্ছিল না। তদন্তকারীদের কাছে তুহিন দাবি করে, অন্যদের নাম না বলার বিষয়ে সে ‘ওয়াদাবদ্ধ’।
এ সময় তার মোবাইল ফোনে বারবার কল আসছিল। কলদাতাদের একজন ছিল অপ্রতিমের বাবার মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করা এক কিশোর। বিষয়টি পুলিশের নজরে এলে ওই কিশোরকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। তার পরনে তখন অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল।
পরে তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও একজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে অপ্রতিমের আইফোন নেওয়ার পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে।
পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এমনকি অপ্রতিম মারা গেলে সেই টাকা আর ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তা থেকেও হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন। তবে এটি এখনো তদন্তের একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ড. কামরুন নাহাত শীলা জানান, ওই কিশোর ঘটনার মাত্র ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার দোকানে বিনা বেতনে কাজ শুরু করেছিল।
অন্যদিকে অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। ওই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ড. কামরুন নাহাত শীলার ভাষ্য, নাহিদা বেগম চান পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখুক—আগের ওই ঘটনার প্রতিশোধের জেরেই তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে কি না।
অপ্রতিম গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার বেলা ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এতে জড়িতদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।