মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জশিতা ইসলাম নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এদিন তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো (পূর্ব) বিভাগের সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর কাদির ভূঁঞা প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও সময় চান। পরে আদালত ৭ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমার দিন ধার্য করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) রুকনুজ্জামান।
ডিবির অভিযোগপত্রে অসন্তুষ্ট বাদীপক্ষ
হাদি হত্যা মামলায় গত ৬ জানুয়ারি ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে ডিবির দেওয়া অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট হতে পারেনি ইনকিলাব মঞ্চ। মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়েছে এবং অভিযোগপত্রে উল্লিখিত তথ্য যথেষ্ট নয়—এমন অসন্তোষ থেকেই নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের।
গত ১২ জানুয়ারি অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। সেদিন আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য আদালতের কাছে দুই দিন সময় চান। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে ১৫ জানুয়ারি পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন।
১৫ জানুয়ারি ডিবির তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নারাজি আবেদন জমা দেন বাদী। পরে আদালত মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে দেন। এরপর থেকে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ বারবার পেছাচ্ছে।
যেভাবে হামলার শিকার হন হাদি
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।
গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনি প্রচারণা ও গণসংযোগের কাজে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গেলে হামলার শিকার হন হাদি। অভিযোগ অনুযায়ী, চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় একটি চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসা আততায়ী তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি।
ঘটনার পর দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য একই রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যুর খবর আসে।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। পরে হাদির মৃত্যুর পর মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা, অর্থাৎ হত্যার অভিযোগ যুক্ত করা হয়। প্রথমে থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করলেও পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব পায় ডিবি পুলিশ।
১৭ জনকে অভিযুক্ত করে ডিবির অভিযোগপত্র
তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ ১৭ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয় ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদকে। অভিযোগপত্রে তার পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠজন এবং হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে আরও কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অভিযোগপত্রে থাকা ব্যক্তিরা হলেন—
ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭)।
মো. হুমায়ুন কবির (৭০)।
হাসি বেগম (৬০)।
সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪)।
ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭)।
মারিয়া আক্তার লিমা (২১)।
মো. কবির (৩৩)।
মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪)।
সিবিয়ন দিউ (৩২)।
সঞ্জয় চিসিম (২৩)।
মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭)।
মো. ফয়সাল (২৫)।
মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬)।
সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী।
ফিলিপ স্নাল (৩২)।
মুক্তি মাহমুদ (৫১)।
জেসমিন আক্তার (৪২)।
ডিবির অভিযোগপত্র অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, সহযোগিতা এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে হত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ
ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য পর্যালোচনা করে তদন্তে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করা এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। এ উদ্দেশ্যে ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা হাদির নির্বাচনি প্রচারণায় অনুপ্রবেশ করেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ডিবির অভিযোগপত্রে উঠে আসা এসব বিষয় এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর সিআইডি কী কী নতুন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, তা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর স্পষ্ট হবে।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবেদন জমা না পড়ায় মামলার বিচারিক কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে অপেক্ষা বাড়ছে। আগামী ৭ ডিসেম্বর সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারে কি না, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।