মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) চট্টগ্রাম দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি দায়ের করেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. রুবেল হোসেন। দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোকাররম হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের নামে ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ভুয়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, জাল ইনভয়েস ও পণ্য সরবরাহের অসত্য নথিপত্র ব্যবহার করা হয়। এসব কাগজপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে অর্থ ছাড় করিয়ে নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সেই অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এ প্রক্রিয়ায় মোট ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের নামে ইসলামী ব্যাংকের বহদ্দারহাট শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। পরে ২০১৭ সালে হিসাবটি ব্যাংকের জুবলী রোড শাখায় স্থানান্তর করা হয়। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামান ৫০০ কোটি টাকা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণের আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়।
ঋণের অর্থ ছাড়ে ভুয়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ঋণের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় ‘ক্লাসিক ট্রেডিং’ নামে একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবহার করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হিসেবে দেখানো হয়েছিল আরামিট গ্রুপের হিসাব বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে। তবে দুদকের অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির নির্ধারিত ঠিকানায় কোনো কার্যালয় বা গুদামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত ক্লিংকার, জিপসাম, লাইমস্টোন ও স্ল্যাগ সরবরাহের নামে ভুয়া ইনভয়েস এবং অন্যান্য কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। বাস্তবে পণ্য সরবরাহ না করেই এসব নথির ভিত্তিতে ২৭টি ‘বাই-মুরাবাহা’ ডিলের বিপরীতে পে-অর্ডার ইস্যু করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাই-মুরাবাহা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি অর্থায়ন পদ্ধতি, যেখানে ব্যাংক কোনো পণ্য কিনে নির্ধারিত মুনাফা যুক্ত করে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। সাধারণত এ ধরনের লেনদেনে পণ্য কেনা, সরবরাহ এবং বিক্রিসংক্রান্ত নথিপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুদকের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট লেনদেনগুলোতে পণ্য সরবরাহের বাস্তবতা ছাড়াই কাগজপত্র ব্যবহার করে অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
এজাহারে বলা হয়েছে, পে-অর্ডারের মাধ্যমে ছাড় করা অর্থের একটি অংশ ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন হিসাব ঘুরে আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এভাবে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মোট ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
জাবেদ-রুকমীলাসহ আসামি ১৫ জন
মামলায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তাঁর স্ত্রী রুকমীলা জামান ছাড়াও আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ শাহ আলম, এজিএম এ কে এম মারুফ এবং মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের জুবলী রোড শাখার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকেও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, ভুয়া নথিপত্রের ব্যবহার এবং অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত কার্যক্রম তদন্তের আওতায় এসেছে। তবে মামলার অভিযোগের বিষয়ে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণ উপস্থাপন এবং আসামিদের বক্তব্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতারণা, জালিয়াতি, অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের মামলার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে মামলা দায়েরের অর্থ এই নয় যে আসামিরা ইতিমধ্যে অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে তদন্তে পাওয়া প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে।