বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে সংকট, শিল্পকারখানায় গ্যাসের ঘাটতি এবং সারের বাজারে অস্থিরতার কারণে দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে প্রায় ছয় লাখ কর্মজীবীর কর্মসংস্থান সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট শুধু শিল্প উৎপাদনেই প্রভাব ফেলছে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পরিবহন, কৃষি, নিত্যপণ্যের বাজার এবং মানুষের আয়-রোজগারেও। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সময় উৎপাদন কমানো, শিফট কমিয়ে দেওয়া কিংবা কর্মীসংখ্যা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এর ফলে শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তিতে থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ দিতে না পারার কথা জানিয়েছে।
এতে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের সময় স্পট মার্কেটে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ২৪ থেকে ২৮ ডলারের মধ্যে উঠেছিল। যুদ্ধের আগের সময়ে বাংলাদেশ সাধারণত ১০ থেকে ১২ ডলারের মধ্যে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি কিনত। ফলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি অর্থবছরে সরকারের জ্বালানি ভর্তুকির চাপ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর পরিমাণ ২৫০ কোটি থেকে ৪৮০ কোটি ডলারের মধ্যে হতে পারে বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বড় অতিরিক্ত ব্যয় সরকারের অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেশের শিল্প খাতের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন সময় কমানো হচ্ছে, কোথাও শিফট কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো শিল্প ইউনিট বন্ধও হয়ে যাচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। নতুন গ্যাস-সংযোগ না পাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে। পোশাক খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রবণতা শুরু হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ছয় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ার যে আশঙ্কা বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ কর্মসংস্থান কমে গেলে তার প্রভাব শুধু চাকরি হারানো ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁদের পরিবারের আয়, ভোগব্যয় এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কোভিড-পরবর্তী ধাক্কা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলে ওঠার চেষ্টা করছিল। এর মধ্যেই নতুন করে জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি জানিয়েছেন, জুলাইয়ে দেশের সার্বিক পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির সরকারি হার কমলেও সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ এখনো বড়। বিশেষ করে খাদ্য, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
জ্বালানি সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকটাই সারের নিয়মিত সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি হেক্টর আবাদি জমিতে গড়ে প্রায় ৩৯২ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
দেশের ইউরিয়া সার কারখানাগুলোও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়েছে। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে গ্যাসের তীব্র সংকটে দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে কয়েকটি কারখানা আবার উৎপাদনে ফেরে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানির ব্যয় বাড়ছে। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব কৃষি উৎপাদনের ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে সারের ব্যবহার বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ও দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস সরবরাহ—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে সারের দাম আরও বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। আর পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকলে দেশীয় সার উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশের আসন্ন আমন ও বোরো মৌসুমের উৎপাদনেও পড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষকের ওপর চাপ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব খাদ্যপণ্যের বাজারেও দেখা দিতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে বাংলাদেশ যে মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে পড়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই অভিজ্ঞতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এবার সংকট কতটা দীর্ঘ হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ জ্বালানি ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দাম—সবগুলো বিষয় একই সঙ্গে চাপে পড়লে অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ছয় লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকির সতর্কবার্তা তাই শুধু শ্রমবাজারের হিসাব নয়; এর সঙ্গে দেশের উৎপাদন, মানুষের আয়, দারিদ্র্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়গুলোও সরাসরি যুক্ত। সংকট দীর্ঘায়িত না করে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং উৎপাদনমুখী খাতগুলোকে সচল রাখা এখন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।