বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাতে তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এ বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বিদ্যালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অভিযোগের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেন। পরে অফিস সহায়ক শাহজামালকে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়। তবে ওই রাতেই তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা করা সম্ভব হয়নি বলে বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যালয়ের একটি সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে শুরু হওয়া তদন্তে নিয়োগ, ভর্তি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে।
এর আগে গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এ বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকীকে কমিটির প্রধান করা হয়। কমিটিকে ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে কমিটির প্রধান বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক শাহজামালের ব্যক্তিগত কম্পিউটার জব্দ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নিয়ে যান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কম্পিউটারে সংরক্ষিত নথি ও তথ্য যাচাই করতে গিয়ে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের বাইরেও কয়েক ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকদের স্বাক্ষর জাল করে মাস্টার রোলে লোক নিয়োগের সঙ্গে শাহজামাল জড়িত ছিলেন। এ ছাড়া তিনি অফিস সহায়ক পদে কর্মরত থাকলেও কম্পিউটার অপারেটর পদে বেতন তুলতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের নথি পাওয়া গেছে, সংশ্লিষ্ট নথিতে ঠিক কার কার স্বাক্ষর রয়েছে এবং কথিত জালিয়াতির সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
মাস্টার রোলে কতজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের পরিচয় কী এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও স্পষ্ট নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নথিগুলোর উৎস, স্বাক্ষরের যথার্থতা এবং নিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শাহজামালের ব্যক্তিগত কম্পিউটারে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং শিফট পরিবর্তনসংক্রান্ত কিছু তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের সঙ্গে কোনো ধরনের অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং এক শিফট থেকে অন্য শিফটে স্থানান্তরের মতো প্রশাসনিক কার্যক্রম সাধারণত নির্ধারিত নিয়ম ও অনুমোদনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা। এ ধরনের কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট আবেদন, অনুমোদনপত্র, শিক্ষার্থীদের তালিকা এবং সংরক্ষিত রেকর্ড যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে।
তবে কম্পিউটারে ভর্তি ও শিফট পরিবর্তনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাওয়ার অর্থই অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব নথির প্রকৃতি, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের বৈধতা যাচাইয়ের পরই অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই নতুন এসব বিষয় সামনে আসায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ও নথিপত্র যাচাই করতে বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে বিদ্যালয়ে যান তদন্ত কমিটির প্রধান এ বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী। এ সময় তিনি বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করেন এবং অভিযোগের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে খোঁজখবর নেন বলে জানা গেছে।
এরপর শাহজামালকে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়। বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাত গভীর হওয়া এবং প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় সেদিন রাতেই তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা করা সম্ভব হয়নি।
একই সূত্রের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ রেজাউল করিম বাদী হয়ে শাহজামালের বিরুদ্ধে মামলা করার উদ্যোগ নেবেন। তবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এ বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, “বিস্তারিত জানার পর সব বলতে পারব। আপাতত অভিযুক্ত থানা হেফাজতে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে জালিয়াতির নানা তথ্য পাওয়া গেছে।”
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়ার কথা। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কারা জড়িত, কীভাবে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ কার্যক্রম ছিল কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একই সঙ্গে মাস্টার রোলে নিয়োগ, বেতনসংক্রান্ত অসংগতি, শিক্ষার্থী ভর্তি ও শিফট পরিবর্তনের অভিযোগগুলো পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি, অনুমোদন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহজামালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তাধীন। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফল, আনুষ্ঠানিক মামলা এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এ ঘটনায় প্রকৃত দায় ও অনিয়মের পরিধি নির্ধারিত হবে।