• শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
সাভারে মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণ: শিক্ষকের স্ত্রী গ্রেপ্তার, অভিযুক্ত পলাতক দ্রব্যমূল্য-জ্বালানি সংকট: দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ চান নাহিদ ‘হুমকি দিয়ে দমাতে পারবে না’, শিক্ষককে চড় মারা রুমির বার্তা এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে ছয় নারী যুগ্ম আহ্বায়ক জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের অনুষ্ঠানে বিরোধীদের অনুপস্থিতি, ধোঁকাবাজি বললেন প্রতিমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, ফিরোজার পরিবারকে ৫ লাখ টাকার সহায়তা সৌদির কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি, মৃত্যুদণ্ডের নথি চাইল ঢাকা সিসিইউতে মঈন খান, হাসপাতালে ছুটে গেলেন রাষ্ট্রপতি ইউরোপে তীব্র গরমে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু অবসরের পর এক বছর ফুটবল থেকেও দূরে থাকতে চান নেইমার

পুলিশের ফাঁড়ির পাশেই এডিশনাল ডিআইজির বাড়িতে বছরজুড়ে মাদকের আসর

newsline24 / ২৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
পুলিশের ফাঁড়ির পাশেই এডিশনাল ডিআইজির বাড়িতে বছরজুড়ে মাদকের আসর
পুলিশের ফাঁড়ির পাশেই এডিশনাল ডিআইজির বাড়িতে বছরজুড়ে মাদকের আসর

রাজধানীর পূর্বাচলে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরের বাড়িতে প্রায় এক বছর ধরে মাদক সেবন, উচ্চ শব্দে ডিজে পার্টি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগ উঠেছে। বাড়িটি থেকে মাত্র ৩০ গজ দূরে পুলিশের ছয়তলা একটি ফাঁড়ি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব আয়োজন কীভাবে চলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানের পর বিষয়টি সামনে আসে। অভিযানে বাড়িটি থেকে ৮৫ জনকে আটক করা হয়। পরে সংক্ষিপ্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বাড়িটিতে নিয়মিত পার্টির আয়োজন করা হতো। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে গান বাজত। বাড়ির বাইরে প্রায়ই সারিবদ্ধভাবে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এসব আয়োজন বেশি হতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, শুরুতে মাসে তিন-চারটি পার্টি হলেও সময়ের সঙ্গে আয়োজনের সংখ্যা বেড়েছে। কোনো কোনো দিন সকালে শুরু হওয়া অনুষ্ঠান রাত পর্যন্ত চলত।

ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবিরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে বাড়িটিতে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টির আয়োজন করা হচ্ছিল। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের যুক্ত করা হতো। ফলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পরিসরে আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল, নাকি নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অংশ—তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

অনলাইন বুকিংয়ে চলত পার্টির আয়োজন

ডিবির তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে মোট ছয়টি কক্ষ ছিল। এর মধ্যে পাঁচটি অতিথিদের ভাড়া দেওয়া হতো। বাকি কক্ষটিতে থাকতেন তত্ত্বাবধায়ক। এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাড়িটি বুকিং দেওয়া হতো। ১০ জনের জন্য পুরো বাড়ি এবং পাঁচটি অতিথিকক্ষের দৈনিক ভাড়া নির্ধারিত ছিল ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। এর বাইরে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে নিবন্ধন ফি হিসেবে নেওয়া হতো ৬০০ টাকা।

পার্টির ব্যবস্থাপনায় মাহবুব আলম সহ-আয়োজক হিসেবে কাজ করতেন বলে জানিয়েছে ডিবি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আয়োজন থেকে অর্জিত মুনাফার ৩০ শতাংশ পেতেন মাহবুব এবং বাকি ৭০ শতাংশ পেতেন বাড়ির মালিক আবদুল্লাহ আল জহির।

মাহবুবের সঙ্গে সমন্বয় করে সাদমান রিফাত ও পরম গুহ নিয়োগী নামের দুই তরুণ পার্টিগুলো আয়োজন করতেন বলে ডিবির তথ্য। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সচ্ছল পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারও ছিলেন বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে বাড়িটিতে অভিযান চালায় ডিবির একটি দল। অভিযানের সময় সেখানে উচ্চ শব্দে গান বাজছিল এবং পুরো বাড়িতে শিশার ধোঁয়া ছড়িয়ে ছিল বলে জানান ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটির বাইরে ও আশপাশে প্রায় ২২টি গাড়ি পাওয়া যায়।

বাড়িটি সম্পর্কে পুলিশের আগে থেকে ধারণা ছিল

খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, বাড়িটি একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার বলে তারা জানতেন। সেখানে নিয়মিত সামাজিক অনুষ্ঠানও হতো। তবে ডিজে পার্টি, মাদক সেবন কিংবা অন্যান্য অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাদের জানা ছিল না। বিষয়টি জানার পর ডিবি অভিযান চালায় বলে তিনি জানান।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তাকর্মী ও মসজিদের ইমামের বক্তব্যে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরেই বাড়িটিতে নিয়মিত গান-বাজনা ও নাচের আয়োজন চলছিল। এসব বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের স্থানীয় পর্যায়ের অজ্ঞতার দাবি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাড়িটি থেকে পুলিশের ফাঁড়ির দূরত্ব মাত্র ৩০ গজ হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা এসব আয়োজন নজরে আসেনি কেন, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ এবং অভিযানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

মাদক কম উদ্ধার, উঠেছে নানা প্রশ্ন

বাড়িটিতে নিয়মিত মাদক সেবনের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি এবং প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযান—সব মিলিয়ে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডিবির জব্দতালিকা অনুযায়ী, অভিযানে ভারতের তৈরি আইকনিক হোয়াইট হুইস্কির একটি বোতল, এক লিটারের রয়্যাল স্ট্যাগ হুইস্কির বোতলে অবশিষ্ট ৫০০ মিলিলিটার এবং এক লিটারের রাশিয়ান স্মিরনফ ভদকার বোতলে অবশিষ্ট ২০০ মিলিলিটার মদ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া দেশীয় কেরু’স ইম্পেরিয়াল হুইস্কির ৭৫০ মিলিলিটারের একটি খালি বোতল, একটি ইয়াবা বড়ি, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং ‘কুশ’ হিসেবে শনাক্ত করা অল্প পরিমাণ পদার্থ জব্দ করা হয়।

নিয়মিত মাদক সেবনের অভিযোগের বিপরীতে এত কম পরিমাণ মাদক উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ইলিয়াস কবির বলেন, ডিবির দল পৌঁছানোর আগেই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা মদ ও ইয়াবা সেবন করেছিলেন। ফলে ঘটনাস্থলে যা অবশিষ্ট ছিল, তা-ই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

তবে উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ দিয়ে সেখানে আগে কতটা মাদক সেবন করা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তদন্তের অন্যান্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।

মাহবুবকে গ্রেপ্তার না করার অনুরোধের অভিযোগ

অভিযানের সময় মাহবুব আলমকে গ্রেপ্তার না করার অনুরোধ জানিয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযান চলাকালে জহির ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবিরকে তিনবার ফোন করেছিলেন।

এ বিষয়ে আবদুল্লাহ আল জহিরের বক্তব্য, বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন বলে তিনি প্রথমে বিশ্বাস করেছিলেন। অতিথিদের মাদক সেবন নিষিদ্ধসহ বাড়ির নিয়মকানুন জানানো হয়েছিল বলেও তার ধারণা ছিল। দায়িত্ব পালনে অবহেলা না করলে একজন দরিদ্র মানুষকে অযথা হয়রানির শিকার হতে দিতে চাননি বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।

জহির আরও বলেন, মাহবুব তাকে জানিয়েছিলেন, অনুষ্ঠানে ৩৫ থেকে ৪০ জন অংশ নেবেন। কিন্তু পরে ডিবির ব্রিফিং থেকে তিনি জানতে পারেন, সেখানে ৮৪ জন ছিলেন। এতে তার কাছে বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।

বাড়িটির ব্যবস্থাপনায় মাহবুবের ভূমিকা খতিয়ে দেখার কথাও জানান জহির। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।

৮৫ জনের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড

ডিবির অভিযানে আটক ৮৫ জনের মধ্যে ২৬ জন নারী ও ৫৯ জন পুরুষ ছিলেন। পরে সংক্ষিপ্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

পুরুষদের প্রত্যেককে এক মাসের কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের আরও ১৫ দিন কারাভোগ করতে হবে। অন্যদিকে, নারীদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিন দিন কারাভোগ করতে হবে।

ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির জানান, নিয়মিত বুকিং, অর্থের বিনিময়ে নিবন্ধন এবং ধারাবাহিকভাবে পার্টি আয়োজনের পেছনে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তারা।

তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ

ঘটনাটি ঘিরে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমত, পুলিশের একটি ফাঁড়ির এত কাছে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পার্টির আয়োজন চললেও স্থানীয় পুলিশ কেন তা জানতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, বাড়িটি ভাড়া দেওয়া ও অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে নিবন্ধন ফি আদায়ের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হতো। তৃতীয়ত, বাড়ির মালিক ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন এবং দায়িত্ব বণ্টন কী ছিল।

একই সঙ্গে অভিযানের আগে মাদক সেবনের অভিযোগের সত্যতা, উদ্ধার করা মাদকের উৎস এবং পার্টি আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করাও জরুরি।

তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে বাড়িটিতে চলা কার্যক্রমের প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। পুলিশের অভিযান ও আটকদের সাজা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে এমন আয়োজন চলার অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নির্ভর করছে তদন্তের ফলের ওপর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category