গাজায় নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছে আট বছরের ফিলিস্তিনি শিশু ওয়াফা ইউসুফ নাবিল আকিলা। স্কুল থেকে পরিবারের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় ওয়াফা ও তার বাবা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হয়েছেন বলে আল-শিফা হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) গাজার হামিদ মোড়ের কাছে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও ওয়াফাকে দেখা গিয়েছিল আনন্দমুখর অবস্থায়। নীল রঙের স্কুল ইউনিফর্ম পরে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে স্কুলে গিয়েছিল সে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে ক্যামেরার দিকে হাসিমুখে থাম্বস-আপ দেখাতেও দেখা যায় শিশুটিকে।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই বদলে যায় সেই দৃশ্য। হামলার পর আগুনে পোড়া একটি গাড়ির ধ্বংসস্তূপের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায় ওয়াফার স্কুলের বই-খাতা ও অন্যান্য জিনিসপত্র। একটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার স্বাভাবিক আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোক ও ধ্বংসের ঘটনায়।
ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। প্রকাশিত ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, বিশ্ব যেন দেখে শিশুটির কী পরিণতি হয়েছে। আরেকজন প্রশ্ন তোলেন, যখন যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে, তখন গাজায় কেন প্রতিদিন মানুষ ও শিশু নিহত হচ্ছে।
ওয়াফার মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলার মধ্যেও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি অব্যাহত থাকায় প্রশ্ন উঠেছে গাজার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে।
হামলার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রথমে জানায়, তারা হামাসের একজন সদস্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। পরে সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী দাবি করে, নিহত ইউসুফ আকিলা হামাসের নুখবা বাহিনীর একজন কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ইসরায়েলি সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন এবং হামাসের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজ করছিলেন। তবে এসব দাবির সমর্থনে প্রকাশ্য কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
ওয়াফার মৃত্যুর ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন গাজার শিশুদের শিক্ষাজীবনও যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে ব্যাহত। চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু হওয়ার কথা থাকলেও কিছু স্কুল ও বিকল্প শিক্ষা কেন্দ্র এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের সংঘাতে গাজার বহু স্কুল ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে তাঁবু, অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ভবনে পড়াশোনা করতে হচ্ছে।
শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ না থাকায় শিশুদের একদিকে যেমন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। স্কুলে ফেরার মতো একটি স্বাভাবিক ও আনন্দের দিনও যে প্রাণঘাতী ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে, ওয়াফার মৃত্যু তারই নির্মম উদাহরণ।
একই দিনে গাজার বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকজন ফিলিস্তিনি শিশু ও তরুণ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার পূর্বদিকে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত সাকিনা স্কুলে গোলাবর্ষণে সাত বছর বয়সী সাদি ঘালিয়া নিহত হয়। গাজা সিটির রিমাল এলাকায় ড্রোন হামলায় ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আতেফ আরাফাত সুক্কার নিহত হন।
এ ছাড়া ফিলিস্তিন স্টেডিয়াম ও আল-মামুনিয়া স্কুলের আশপাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত ১৯ বছর বয়সী হাসান আলি সাকাল্লাহ পরে মারা যান বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ওয়াফার মৃত্যু তাই কেবল একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; যুদ্ধের মধ্যে গাজার শিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, সেটিও সামনে এনেছে। নতুন বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়া একটি শিশুর স্বাভাবিক স্বপ্ন যেখানে হামলার ধ্বংসস্তূপে থেমে যায়, সেখানে শিক্ষাবর্ষের শুরুটিও হয়ে ওঠে গভীর মানবিক বেদনার প্রতীক।