• মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২১ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
‘মারবা ঠিক আছে, বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে আসি’—তারপরও চলল নির্যাতন হারানো অস্ত্র উদ্ধারে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান মহাদেবপুরে স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা, লুট টাকা-স্বর্ণ তার লম্বা, এ কারণে বিদ্যুৎ চলে যায়’—মন্ত্রীর কথায় ক্ষুব্ধ ডেপুটি স্পিকার ভাঙ্গায় বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, নিহত ২ যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে হত্যাকাণ্ড: অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ৪ দেশে ফেরার স্বপ্ন থামল সৌদির সড়কে, প্রাণ গেল ৪ বাংলাদেশির গ্যাস সরবরাহ বাড়লে কমবে লোডশেডিং জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সাত মাসে নিখোঁজের ১৫ হাজার জিডি, এখনো নিখোঁজ ২ হাজারের বেশি জুলাই আন্দোলনে স্বামী নিহত, সাক্ষ্য দেওয়ায় মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ

‘মারবা ঠিক আছে, বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে আসি’—তারপরও চলল নির্যাতন

newsline24 / ২৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
‘মারবা ঠিক আছে, বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে আসি’—তারপরও চলল নির্যাতন
‘মারবা ঠিক আছে, বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে আসি’—তারপরও চলল নির্যাতন

রাজধানীর খিলক্ষেতে ২৫ বছর বয়সী মুক্তা ইসলাম মাওয়ার মৃত্যুকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। পরিবারের দাবি, স্বামী সোহেল শিকদারের দীর্ঘদিনের নির্যাতনের পর তাঁকে হত্যা করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ স্বজনদের। তবে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে মুক্তাকে বাসার একটি কক্ষে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করেন সোহেল। ওই নির্যাতনের প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিওও ধারণ করা হয়। ভিডিওতে মুক্তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। ব্যথায় কাতর হয়ে তিনি স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ পাশের কক্ষে তখন কান্না করছিল তাঁর দুই সন্তান—পাঁচ বছরের সাফওয়ান ও চার বছরের তাসফিয়া।

ভিডিওতে সোহেলকে মুক্তাকে উদ্দেশ করে হুমকি ও গালাগাল করতে শোনা যায়। একপর্যায়ে মুক্তা তাঁকে বলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ এরপরও তাঁর ওপর মারধর চলতে থাকে। নির্যাতনের একপর্যায়ে মুক্তা কাতর হয়ে আর মারধর না করার আকুতি জানান।

পরিবারের ভাষ্য, গত ৩০ আগস্ট মুক্তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়। ওই ঘটনার ভিডিও সোহেল মুক্তার এক স্বজনের কাছে পাঠিয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে বলেন। ভিডিও পাঠানোর পাশাপাশি মুক্তাকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর কয়েক দিন পর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে মুক্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মরদেহ সিলিং ফ্যান থেকে নামানো হয়েছিল। তাঁদের সন্দেহ, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

মুক্তার ছোট ভাই তানভীর রহমানের করা মামলায় স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ এবং যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তানভীরের দাবি, কয়েক মাস আগে সোহেল তাঁর কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তাঁর বোনকে মারধর করা হতো।

স্বজনেরা জানান, মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁরা খিলক্ষেতে বসবাস করছিলেন। সোহেল প্রথমে মুদি দোকানের ব্যবসা করতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হলেও সেখানে সফল হতে পারেননি। এরপর থেকেই স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য কলহ বাড়তে থাকে এবং শ্বশুরবাড়ির কাছে যৌতুক দাবি করা শুরু হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।

মুক্তার ভাই তানভীর বলেন, ছোটবেলায় তাঁদের বাবা মারা যাওয়ার পর মা চার ভাই-বোনকে বড় করেছেন। পরিবারের কথা চিন্তা করে মুক্তা স্বামীর নির্যাতনের অনেক ঘটনাই গোপন রাখতেন। নির্যাতন সহ্য করেও তিনি মৃত্যুর আগে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেননি বলে জানান তাঁর ভাই।

মুক্তার মৃত্যুর পর তাঁর দুই সন্তানকে নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বজনদের ভাষ্য, মাকে হারিয়ে শিশুদুটি সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে এবং বাবার বিরুদ্ধে মাকে মেরে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ করছে।

খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন জানান, মুক্তাকে মারধরের যে ভিডিও পাওয়া গেছে, সেটি তাঁর মৃত্যুর তিন দিন আগের। ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মুক্তার মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা—ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মুক্তার মৃত্যুর ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ নারী নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে ১৮ হাজার ৬২৬টি কল আসে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৩৩টি। ২০২৩ সালে ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৬ হাজার ৫৬০টি। আর ২০২১ সালে ১২ হাজার ১৬৯টি অভিযোগের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।

এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মুক্তার মৃত্যুর মতো ঘটনা পারিবারিক নির্যাতনকে সময়মতো শনাক্ত ও প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে। বিশেষ করে নির্যাতনের অভিযোগের পর ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখন ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পরবর্তী ধাপেই পরিষ্কার হবে মুক্তার মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা কী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category