ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার প্রসঙ্গ টেনে নিজেও ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ শিকার হচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ অভিযোগ করেছেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। একই সঙ্গে বিচার শেষ হওয়ার আগেই গণমাধ্যমে কাউকে খুনি বা ধর্ষক হিসেবে উপস্থাপন না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ নিজের বিরুদ্ধে চলমান মামলার শুনানির সময় এ অভিযোগ করেন জিয়াউল আহসান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় তিনি আসামির কাঠগড়ায় রয়েছেন।
এদিন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন একক বেঞ্চে মামলার ১১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে এক কনস্টেবল জবানবন্দি দেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজনীন নাহার গণমাধ্যমে মামলার তথ্য প্রকাশ নিয়ে আপত্তি জানান।
তার অভিযোগ, প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের জবানবন্দির বিভিন্ন অংশ গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হলেও আসামিপক্ষের জেরা বা প্রতিপক্ষের বক্তব্য একইভাবে সামনে আসে না। এতে মামলাটি নিয়ে জনমনে একপেশে ধারণা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এরপর কাঠগড়ায় থাকা জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালের কাছে কথা বলার অনুমতি চান। অনুমতি পেয়ে তিনি বলেন, তারা বিচারের জন্য আদালতে এসেছেন। এ ক্ষেত্রে বিচার শেষ হওয়ার আগে গণমাধ্যমে কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ঠিক নয়।
নুসরাত হত্যা মামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি ওই মামলায় হাইকোর্ট ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন। আইনজীবী শিশির মনির ও তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ওই মামলায় অতিরিক্ত মিডিয়া ট্রায়ালের প্রভাবের কথা বলেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
জিয়াউল আহসানের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের পর থেকেই গণমাধ্যমে এমনভাবে তাকে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন দেশের একমাত্র অপরাধী তিনিই। তিনি বলেন, ‘আমার ক্ষেত্রেও একই রকম হচ্ছে। গ্রেপ্তারের পর মনে হয় আমিই একমাত্র অপরাধী, এ দেশে আর কেউই নেই।’
কাঠগড়ায় থাকা এই আসামি আরও অভিযোগ করেন, হাজতখানায় কেক কাটার একটি ঘটনা নিয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার দাবি, যে দিন কেক কাটার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রচার করা হয়েছে, সেদিন তিনি সেখানে ছিলেন না এবং কে কেক কেটেছেন সেটিও তার জানা নেই। অথচ এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে ‘মিথ্যা সংবাদ’ প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ সময় অতিরিক্ত মিডিয়া ট্রায়াল বন্ধে ট্রাইব্যুনালের হস্তক্ষেপ কামনা করেন জিয়াউল আহসান।
বিষয়টি চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পৌঁছে দিতে উপস্থিত প্রসিকিউটরদের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে বিচারাধীন মামলার বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন আদালত।
ট্রাইব্যুনাল বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে ‘খুনি’ বা ‘ধর্ষক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠতে পারে। যদি আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে আদালতে বিচারের প্রয়োজনীয়তাই বা কোথায়—এমন প্রশ্নও তোলেন ট্রাইব্যুনাল।
জবাবে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউশন কারও বক্তব্য বিকৃত করে না এবং কোনো আসামির নাম বা বক্তব্যের ক্ষেত্রেও ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃতি করা হয় না। পাশাপাশি আসামিদের সঙ্গে যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা খারাপ আচরণ না করেন, সে বিষয়ে তাদের সতর্ক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ সময় দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার ডিফেন্স সাক্ষী সুখরঞ্জন বালির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, একজন সাক্ষীকে গাড়ি থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তার ভাষায়, এর চেয়ে বেশি নির্যাতিত আর কে হতে পারেন?
জিয়াউল আহসানের আরেক আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বিচারাধীন মামলার বিষয়ে তারা সাধারণত গণমাধ্যমে কথা বলতে চান না। তবে প্রসিকিউশন পাল্টা অভিযোগ করে জানায়, জিয়াউল আহসানের পক্ষে আইনজীবী নাজনীন নাহার বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
এভাবে আদালতে একদিকে বিচারাধীন মামলায় গণমাধ্যমের ভূমিকা ও সংবাদ পরিবেশনের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, অন্যদিকে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের বক্তব্যও পরস্পরের বিপরীতে উঠে আসে। তবে মামলার চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়াই।