আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বসেরা অভিনেত্রী’ আখ্যা দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের গণভবনে ডেকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি এসব ঘটনায় শেখ হাসিনা সম্পৃক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় ভোলার লালমোহন উপজেলা নাগরিক সমাজের উদ্যোগে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
স্পিকার বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন বিশ্বসেরা অভিনেত্রী। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের গণভবনে ডেকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি গুমের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা ছিল।’
তিনি অভিযোগ করেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের গণভবনে ডেকে এনে শেখ হাসিনা তাদের সান্ত্বনা দিতেন। স্ত্রী-সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত করতেন যে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অথচ তার দাবি, একই সময়ে গুমের ঘটনার সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততা ছিল।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, শেখ হাসিনা নিজেই গুম হওয়া ব্যক্তিরা কোথায় আছেন, সে বিষয়ে জানতেন বলে তিনি মনে করেন। তবে স্বজনদের সামনে এমন আচরণ করতেন, যেন নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরে পাওয়ার জন্য তিনিও উদ্বিগ্ন। তার ভাষ্য, তখন সাধারণ মানুষ বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের ঘটনায় সাক্ষ্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন স্পিকার। তিনি বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের বক্তব্য ও উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে এসব ঘটনা নিয়ে মানুষের সামনে নতুন তথ্য এসেছে। এ সময় তিনি শেখ হাসিনাকে গুমের নির্দেশদাতা বলেও অভিযোগ করেন।
বক্তব্যে দীর্ঘদিন গোপন বন্দিত্বের শিকার এক ব্যারিস্টারের প্রসঙ্গও আনেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিকে আট বছর হাতকড়া পরিয়ে ‘আয়না ঘরে’ বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার সঙ্গে নির্মম আচরণ করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর ওই ব্যক্তি মুক্ত হন এবং পরে সংসদ সদস্য হয়েছেন বলে দাবি করেন স্পিকার।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে লুটপাট ও দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে একটি বালিশের দাম ৬০ হাজার টাকা এবং একটি পর্দার দাম ৪২ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল।
এ ছাড়া তৎকালীন একজন ভূমি প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে লন্ডনে ৩৬০টি বাড়ির মালিকানার অভিযোগ করেন তিনি। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে না করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
নিজের নির্বাচনি এলাকার অতীত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্পিকার। তার অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে লালমোহনের স্থানীয় এমপি ছিলেন একজন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী ও খুনি’। ২০১০ সালের উপনির্বাচনের সময় ঢাকা থেকে লোক এনে তার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ওই সময় তার নেতাকর্মীদের রামদা দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয় এবং বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। তার নির্বাচনি প্রধান সমন্বয়ক ও ভোলা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আলমও হামলার শিকার হয়েছিলেন বলে জানান তিনি। আহত অবস্থায় তাকে দেখতে হাসপাতালে গেলেও সেখানে প্রবেশ করতে পারেননি বলে দাবি করেন স্পিকার।
মতবিনিময় সভার শেষ পর্যায়ে নিজের নির্বাচনি এলাকার মানুষের কাছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনে তারা সন্তুষ্ট কি না, তা জানতে চান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
এ সময় অনেকটা সংসদীয় পদ্ধতির আদলে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মতামত জানতে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নেওয়া হয়। ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে উপস্থিত ব্যক্তিরা করতালি দেন। পরে করতালির মধ্য দিয়ে মতবিনিময় সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবালের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বাবুল অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। এতে স্থানীয় বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।