বাংলাদেশে বসবাসকারী মানুষকে ধর্ম, সম্প্রদায় বা অন্য কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই ‘সংখ্যালঘু’ পরিচয়ের পরিবর্তে সবাইকে প্রথমে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর পলাশী মোড়ের ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে ‘কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী উৎসব ১৪৩৩’ উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশে কোনো জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষকে আলাদা করে ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় মানুষের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ হলেও রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেকের নাগরিক অধিকার সমান হওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, সবার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত—‘আমরা সবাই বাংলাদেশি’।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সরকারের মূল নীতি হলো সবার জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গও তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, একসময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাঁর দাবি, দেশের সচেতন মানুষ এ ধরনের রাজনৈতিক ধারণা ও বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় আচার পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় এবং সেসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা জানান।
সংবিধানের প্রসঙ্গ তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা। ধর্মের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। এই অধিকার শুধু সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনেও কার্যকর করার কথা জানান তিনি।
ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রচলিত ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ শব্দবন্ধের পরিবর্তে ‘ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং শান্তি’—এ ধরনের ইতিবাচক শব্দ ব্যবহারের পক্ষে মত দেন তিনি। তাঁর মতে, ইতিবাচক ভাষার চর্চা সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে পারে।
গণতন্ত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের জনগণই শেষ বিচারের জায়গা। গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় করতে এবং উগ্রবাদ ও অসুর শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ। উদ্বোধক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। অনুষ্ঠানের শুরুতে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে জন্মাষ্টমীর মিছিলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিষয়ক বিশেষ সহকারী, প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার বিজন কান্তি সরকার এবং ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস (সাধন)।
অনুষ্ঠান শেষে ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমী মিছিলটি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গন থেকে বের হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাহাদুর পার্কে গিয়ে শেষ হয়। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং নাগরিক সমতার বার্তাও তুলে ধরা হয়