অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর আদায় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর। একই সঙ্গে বন্ধ কলকারখানা চালু, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রাশেদ আল তিতুমীর জানান, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল রয়েছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায়ের হার বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বাড়ানো এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব লক্ষ্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, সংস্কারের মূল দায়িত্ব সরকারেরই থাকবে। রাজনৈতিক সরকার নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী সংস্কারের মালিকানা নিলে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের পরামর্শের সঙ্গে সমন্বয় করলে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অতীতের অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার কারণে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তাঁর মতে, অতীতে কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে রাজস্ব আহরণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়েছে। ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান রাশেদ আল তিতুমীর। তাঁর ভাষ্য, সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার জ্বালানির দাম পুরোপুরি বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করেনি।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে পরিবার কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তিনি বলেন, স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থায়ন চায় সরকার।
বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। তবে এ অর্থায়নের আওতা, শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
তাঁর মতে, শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে থাকা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন রাশেদ আল তিতুমীর। থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো মৌসুমি ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। ফলে কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে, যেখানে এক দেশে কাঁচামাল উৎপাদিত হবে, অন্য দেশে মধ্যবর্তী পণ্য তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হবে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানো, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কৃষি, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ আহরণে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও তুলে ধরেন তিনি।
সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশ সফর করেছে। এ ছাড়া সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্লাগ অ্যান্ড প্লে এবং প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
রাশেদ আল তিতুমীর জানান, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতিমধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা থেকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণকে সমন্বিত করে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করা। একই সঙ্গে শিল্পায়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায় সরকার।