বিশ্বের চলমান অস্থিরতা, বৈষম্য ও নানা সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নীতি, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
বুধবার (২৬ আগস্ট) রাজধানীর চাঁন কমিউনিটি সেন্টারে ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি উপলক্ষে আহলা দরবার শরীফ আয়োজিত পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)-এর সেমিনার ও মিলাদ মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আবদুস সালাম বলেন, মহানবী (সা.)-এর আগমন ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, সাম্য ও কল্যাণের বার্তা। তাঁর জীবন ও কর্মে মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, ভ্রাতৃত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতার যে শিক্ষা রয়েছে, তা অনুসরণ করলে সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ইসলামকে বিভিন্নভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হলেও মহানবী (সা.) যে পথ দেখিয়েছেন, সেখানে মানুষের কল্যাণ, ন্যায় ও সাম্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের নানা সংকট মোকাবিলায় তাঁর আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়েও বক্তব্য দেন ডিএসসিসি প্রশাসক। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এসব সংকট নতুন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। অতীতের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সেগুলো রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়।
আবদুস সালামের ভাষ্য, বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে সময়ের প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
পুরান ঢাকার নাগরিক সমস্যাগুলোর মধ্যে জলাবদ্ধতাকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, পুরান ঢাকার নাজুক ও ক্ষতিগ্রস্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় পানি জমে যায়।
জলাবদ্ধতা নিরসনে সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বৃষ্টির পানি কার্যকরভাবে বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথও সংকুচিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ডিএসসিসি প্রশাসক। খাল, বিল, পুকুর ও বিভিন্ন খোলা জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণের ফলে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পুরান ঢাকার সরু রাস্তা, ঘনবসতি ও দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই নাগরিক সেবা উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলেও জানান আবদুস সালাম।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতার ওপরও জোর দেন ডিএসসিসি প্রশাসক। তিনি বাসাবাড়ি, আঙিনা এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটতে পারে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ইসলামের পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক শিক্ষার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে এলাকাটিকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটনবান্ধব করে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান আবদুস সালাম।
এ জন্য বুড়িগঙ্গা নদী পরিষ্কারের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ, ঘুড়ি ওড়ানো, সাইকেল চালানো, কাওয়ালি ও কাসিদার মতো সাংস্কৃতিক আয়োজন ফিরিয়ে আনার কথা বলেন তিনি। তাঁর পরিকল্পনায় পুরান ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিনোদনের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ কর্মসূচির পরিকল্পনার কথাও জানান ডিএসসিসি প্রশাসক।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সপ্তাহে দুই দিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বাসে করে পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সফরে আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, শহীদ মিনার, বড় কাটরা ও তারা মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ থাকবে শিক্ষার্থীদের।
আবদুস সালামের মতে, শুধু পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস পড়ার পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সরাসরি দেখার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ ও সেগুলোকে নাগরিক ও পর্যটন আকর্ষণের অংশ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
সেমিনার ও মিলাদ মাহফিলে মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম ও আদর্শের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মানুষের কল্যাণ কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।