• বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৮ অপরাহ্ন

নেপালে হঠাৎ বন্যায় ২২ মৃত্যু, নিখোঁজ শতাধিক

newsline24 / ১০ Time View
Update : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
নেপালে হঠাৎ বন্যায় ২২ মৃত্যু, নিখোঁজ শতাধিক
নেপালে হঠাৎ বন্যায় ২২ মৃত্যু, নিখোঁজ শতাধিক

নেপালের উত্তরাঞ্চলে তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় পাহাড়ি নদীতে আকস্মিক পানির ঢলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে ভোতেকোশি নদীতে হঠাৎ প্রবল স্রোতে পানি নেমে এলে নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক শ মানুষ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বুধবার সকাল ৯টার দিকে ভোতেকোশি নদীতে স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক মাত্রায় পানির প্রবাহ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর পানি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আকস্মিক এই পানির তোড়ে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল অংশের লেন্দে নদীতে বড় ধরনের বরফধসের কারণে পানিপ্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে যায়। এর ফলে উজানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে একটি প্রাকৃতিক জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একই সময় পার্শ্ববর্তী তিব্বত অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কম্পনে বরফ ও মাটির তৈরি ওই প্রাকৃতিক বাধ ভেঙে গিয়ে জমে থাকা পানি হঠাৎ নিচের দিকে নেমে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা।

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জলবায়ু গবেষক রিজান ভক্তের প্রাথমিক অনুসন্ধানেও লেন্দে নদীতে বরফধসের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে ভূমিকম্পের সঙ্গে আকস্মিক পানির ঢলের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি।

অতিবৃষ্টির বন্যা নয়, খতিয়ে দেখা হচ্ছে একাধিক কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটি সাধারণ অতিবৃষ্টিজনিত বন্যার চেয়ে আকস্মিক পানির বিস্ফোরণ বা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’-এর সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। উজানে পানি আটকে থাকার পর কোনো প্রাকৃতিক বাধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পানির চাপ নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ বাসিন্দাদের সতর্ক হওয়ার সময় খুব কম থাকে।

তবে এই বন্যার পেছনে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ বা ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ (GLOF) কাজ করেছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করে দেখছেন গবেষকেরা। হিমবাহ গলে বা বরফধসের কারণে পাহাড়ি এলাকায় পানি জমে হ্রদ তৈরি হতে পারে। কোনো কারণে সেই হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ে বিপুল পানির স্রোত নেমে আসে।

ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে আরও তথ্য সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ফলে এখনই বন্যার কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছেন না সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান

আকস্মিক বন্যার পর দুর্গম সীমান্ত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে কাজ করছেন। তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, প্রবল পানির স্রোত এবং যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতির কারণে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে।

নদীর আশপাশের অনেক এলাকায় হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় আশ্রয় নেন। পানির তোড়ে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকারীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও বেগ পেতে হচ্ছে।

স্থানীয় প্রশাসন নদীতীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে ভোতেকোশি ও আশপাশের নদীগুলোর পানি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে, কারণ পাহাড়ি নদীতে উজান থেকে নতুন করে পানির ঢল নেমে এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

আগেও ঘটেছিল একই ধরনের ঘটনা

ভোতেকোশি নদী এলাকায় এর আগেও বরফধসের কারণে পানিপ্রবাহে বাধা তৈরির ঘটনা ঘটেছে। গত বছরও একই নদীতে বরফধসের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছিল। তবে তখন পরিস্থিতি বড় ধরনের আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়নি।

হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের পরিবর্তন এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে নদীর উজানে বরফ বা পাথরের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হলে সেটি ভেঙে যাওয়ার ঘটনা নিচের জনপদে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

রসুয়ার এবারের ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধার অভিযানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু, নদীর গতিপথ এবং উজানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্যার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ও ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category