• রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৩ অপরাহ্ন

বাবাকে দেখেনি ৫ বছরের মেয়ে, এবার লাশটাও কি দেখবে না !

newsline24 / ১০ Time View
Update : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাবাকে দেখেনি ৫ বছরের মেয়ে, এবার লাশটাও কি দেখবে না !
বাবাকে দেখেনি ৫ বছরের মেয়ে, এবার লাশটাও কি দেখবে না !

‘আমার বাবা ২৩ বছর আগে সৌদি আরবে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর লাশ দেশে আনতে পারিনি। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়েছিল। এবার আমার ভাইও সৌদি আরবে মারা গেল। তাঁর লাশটাও কি দেশে আনতে পারব না?’

কথাগুলো বলছিলেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকার রোকসানা আক্তার। এক ভাইয়ের মৃত্যুর শোকের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সামনে এখন যোগ হয়েছে আরেক দুশ্চিন্তা—সৌদি আরব থেকে মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হবে কি না।

রোকসানার ভাই মো. সোহাগ গত সোমবার সৌদি আরবের আবহা শহরে নিজের বাসায় মারা যান। পরিবারের ভাষ্য, তিনি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ স্থানীয় একটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। স্বজনেরা মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সোহাগের মৃত্যু যেন ২৩ বছর আগের পুরোনো ক্ষত আবারও সামনে এনে দিয়েছে। তাঁর বাবা রফিক উদ্দিনও সৌদি আরবে প্রবাসী ছিলেন। ২০০৩ সালে দেশটিতেই তাঁর মৃত্যু হয়। সে সময় নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়নি। সৌদি আরবেই তাঁকে দাফন করা হয়।

রফিক উদ্দিনের একমাত্র ছেলে সোহাগ ২০১৮ সালে সৌদি আরবে যান। জীবিকার প্রয়োজনে সেখানে কাজ করছিলেন তিনি। ২০২১ সালে সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন। একই বছর আবার সৌদি আরবে ফিরে যান। এরপর আর দেশে ফেরা হয়নি তাঁর।

সোহাগের পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী আমেনা বেগম, দুই মেয়ে এবং মা রৌশন আরা বেগম। বড় মেয়ে ফাতেমা জাহান ইকরার বয়স ১০ বছর। ছোট মেয়ে উম্মে জামিলা ঈশার বয়স মাত্র পাঁচ বছর।

সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গাটি এখানেই। সোহাগ যখন ২০২১ সালে সৌদি আরবে ফিরে যান, তখন তাঁর ছোট মেয়ে ঈশা মায়ের গর্ভে। অর্থাৎ, জন্মের পর থেকে বাবাকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়নি শিশুটির। বাবার মুখের স্মৃতি তার নেই। এখন বাবার মরদেহও যদি বিদেশেই থেকে যায়, তাহলে শেষবারের মতো বাবাকে দেখার সুযোগটুকুও হারাবে সে।

ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে রোকসানা বারবার তাঁর ছোট ভাইঝির প্রসঙ্গ তুলছিলেন। তাঁর আক্ষেপ, ‘বাবার মতো আমার ভাইয়ের লাশও বিদেশে পরিবার-পরিজনের অনুপস্থিতিতে দাফন করতে হবে। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়েটি বাবাকে কখনো সামনাসামনি দেখেনি, লাশটাও কি দেখবে না?’

পরিবারের সদস্যরা জানান, সোহাগ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর আয়েই স্ত্রী, দুই সন্তান ও মায়ের সংসার চলত। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি এখন আর্থিকভাবেও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

স্বজনেরা আরও জানান, মৃত্যুর আগে কিছুদিন ধরে সোহাগ মানসিক চাপের মধ্যেও ছিলেন। কয়েক মাস আগে তাঁর আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে পাসপোর্টের মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নবায়ন করতে না পারায় তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এর মধ্যেই তাঁর মৃত্যুর খবর আসে।

সোহাগের মৃত্যুর পর থেকে তাঁর বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। স্বামীকে হারিয়ে তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগম বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এবং কখনো কখনো সংজ্ঞাও হারাচ্ছেন বলে জানান স্বজনেরা।

এ অবস্থায় পরিবারের প্রধান চাওয়া একটাই—সোহাগের মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। স্বজনেরা চান, নোয়াখালীর নিজ এলাকায় তাঁকে দাফন করা হোক। তাঁর মা যেন ছেলের শেষ মুখটি দেখতে পারেন, স্ত্রী যেন স্বামীকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে পারেন। আর পাঁচ বছরের ঈশা যেন জীবনে প্রথমবারের মতো হলেও বাবাকে সামনে থেকে দেখতে পারে।

রোকসানা আক্তারের ভাষায়, ‘আমরা চাই, আমার ভাইয়ের লাশটা যেন সরকার দেশে আনার ব্যবস্থা করে। আমরা যেন তাঁকে শেষবারের মতো একটু দেখতে পারি, এলাকার কবরস্থানে দাফন করতে পারি। তাঁর দুই মেয়ে যেন বাবার লাশটা অন্তত দেখতে পারে। এতটুকুই শুধু চাই সরকারের কাছে।’

একজন প্রবাসীর মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষকে হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্বজনদের শেষ বিদায়ের অধিকার, সন্তানের বাবাকে শেষবার দেখার আকাঙ্ক্ষা এবং বছরের পর বছর দূরদেশে থাকা পরিবারের অসহায় অপেক্ষা। সোহাগের পরিবার এখন সেই অপেক্ষাতেই আছে—কবে প্রিয় মানুষটির মরদেহ দেশে ফিরবে, আর কবে তাঁকে আপনজনদের পাশে শেষবারের মতো বিদায় জানানো যাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category