• রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২২ অপরাহ্ন

চোখে আঘাত, হাসপাতালে চিকিৎসা; ইনজেকশনের পরই শিশুর মৃত্যু

newsline24 / ৪ Time View
Update : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চোখে আঘাত, হাসপাতালে চিকিৎসা; ইনজেকশনের পরই শিশুর মৃত্যু
চোখে আঘাত, হাসপাতালে চিকিৎসা; ইনজেকশনের পরই শিশুর মৃত্যু

নোয়াখালী সদর উপজেলায় একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ১৩ বছরের এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, চোখে আঘাত পাওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে শিশুটিকে কয়েকটি ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে নোয়াখালী পৌরসভার দত্তেরহাট এলাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে। নিহত শিশুটির নাম মো. মোসলেম। সে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরবসু গ্রামের মাহফুজুর রহমানের ছেলে। চরবসু এলাকাটি নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত।

শিশুটির স্বজনদের ভাষ্য, শনিবার বিকেলে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলার সময় অন্য একটি শিশুর আঘাত তার চোখে লাগে। এতে চোখে রক্ত জমে যায় এবং চোখের চারপাশ ফুলে ওঠে। পরে তার মা-বাবা তাকে স্থানীয় চেউয়াখালী বাজারে এক পল্লী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চোখের আঘাত গুরুতর হওয়ায় ওই চিকিৎসক তাকে চক্ষু হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

এরপর মোসলেমকে দত্তেরহাটের ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে ‘বড় ডাক্তার’ আসবেন বলে তাদের প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করানো হয়। পরে আবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তি এসে শিশুটিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। সেখানে তার চোখে তিনটি ইনজেকশন দেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।

স্বজনদের অভিযোগ, ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই মোসলেমের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সে অচেতন হয়ে পড়ে এবং তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। এ সময় আবুল হোসেন শিশুটিকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। তবে পরিবারের সদস্যরা তাকে সঙ্গে নিয়েই ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে যান।

সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সন্ধ্যা পৌনে ৮টার দিকে ১৩ বছরের ওই শিশুকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তবে কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

এদিকে ঘটনার পর আবুল হোসেনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি নিজেকে ডিপ্লোমাধারী সিনিয়র অপটোমেট্রিস্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার দাবি, শিশুটির চোখের ওপর ও নিচের পাতা অনেকটা ফুলে ছিল। চোখের ভেতরের কর্নিয়া পরীক্ষা করার জন্য আপার লিড ও লোয়ার লিডে ‘জেসোকেইন’ ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি চোখ অবশ করার কাজে ব্যবহার করা হয়।

আবুল হোসেনের দাবি, ইনজেকশন দেওয়ার আগে শিশুটি বমি করে। এরপর তার খিঁচুনি শুরু হয়। খিঁচুনি দেখা দিলে তাকে নোয়াখালী সদর এলাকার দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী এবং ইনজেকশন বা চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পর বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।

নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, অপটোমেট্রিস্টদের কাজ মূলত চোখ পরীক্ষা করা এবং সাধারণ চশমার প্রেসক্রিপশন দেওয়া। তাদের সার্জারি করার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় আবুল হোসেন কী ধরনের চিকিৎসা দিয়েছেন এবং হাসপাতালটির কার্যক্রম যথাযথ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসবে।

ঘটনার পর সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে গিয়ে কাউকে পাননি। পরে শিশুটির স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন। পরিবারের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আগেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলার সদ্যবিদায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাইমা নুসরাত জাবীন। তার তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়ায় ২০২৪ সালের ৮ জুন অভিযান চালিয়ে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে আগের অভিযোগের পর প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে আবার কার্যক্রম চালাচ্ছিল, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ হাসপাতালে যায়। অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় এখন মূলত দুটি বিষয় তদন্তের অপেক্ষায়—শিশুটির মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এবং হাসপাতালে তাকে দেওয়া চিকিৎসা ও ইনজেকশনের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র ছিল কি না। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তের ফলের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category