নাটোরের গুরুদাসপুরে পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে। একই মামলায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে আরও দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে বড়াইগ্রাম আমলী আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তৌহিদুল ইসলাম সুমন তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. নজরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার রিমান্ডের মেয়াদ শেষ হলে তাঁকে আদালতে হাজির করে আরও সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত রিমান্ড আবেদন গ্রহণ করলেও সেদিন শুনানি না করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য কোনো তারিখও নির্ধারণ করা হয়নি।
ডিবি পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, মিন্টু রিমান্ডে থাকাকালেই শুক্রবার ভোর ৩টার দিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে আলামিন হোসেন (২৬) ও আনিসুর রহমান (২৫) নামের দুজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু জানাতে চাননি তিনি।
হামলার ১২ দিন পর মৃত্যু শাকিলের
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)। হেলমেট পরা কয়েকজন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে তাঁর ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে হামলাকারীরা।
স্থানীয়রা আহত শাকিলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। সেখানে টানা ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম গুরুদাসপুর থানায় মামলা করেন। ছেলের মৃত্যুর পর মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে ২৬ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাঁকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। মামলাটির তদন্ত করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও তৈরি হয়েছে উত্তেজনা
শাকিল হত্যার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মিন্টুকে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এদিকে মঙ্গলবার শাকিলের জানাজা শেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলের একটি শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে শপিংমলে হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এসব ঘটনার মধ্যে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে ঘিরেও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে তাঁর একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে নাটোর জেলা বিএনপি।
তবে নিজের ও ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল বলে দাবি করেছেন সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। তাঁর ভাষ্য, তাঁকে এবং তাঁর সন্তানকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরিবারকে সমবেদনা, বিচারের আশ্বাস
শাকিলের মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁর গুরুদাসপুর পৌরসভার খোয়ারপাড়া খামারনাচকৈড় এলাকার বাড়িতে যান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল হাসান রাকিব। তাঁরা নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শোকসন্তপ্ত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান।
এ সময় অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং সঠিক বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তাঁরা।
শাকিল হত্যা মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং নতুন করে দুজনকে আটক করার মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তবে হামলার পরিকল্পনা, প্রকৃত হামলাকারীদের পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ এখনো তদন্তসাপেক্ষ। পুলিশি তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে মামলার অগ্রগতি।