• মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৭ অপরাহ্ন

হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা, ফের ঊর্ধ্বমুখী তেলের বাজার

newsline24 / ২৩ Time View
Update : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা, ফের ঊর্ধ্বমুখী তেলের বাজার
হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা, ফের ঊর্ধ্বমুখী তেলের বাজার

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাই বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) ইরানের লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করে। এর পরদিন সোমবার (৩১ আগস্ট) এশিয়ার বাজারে তেলের দামে দ্রুত উত্থান দেখা যায়।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দামও প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যায়।

লারাক দ্বীপে হামলা, পাল্টা জবাব ইরানের

রোববার ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ওই স্থাপনাগুলো ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন বসানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।

তবে হামলার প্রভাব নিয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এতে কয়েকজন ইরানি সেনা ও বেসামরিক ব্যক্তি হতাহত হয়েছেন।

এরপর ইরান জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর দুটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

দুই পক্ষের এই সামরিক তৎপরতা কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা যেখানে অচলাবস্থায় রয়েছে, সেখানে নতুন হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

হরমুজ প্রণালিই বড় উদ্বেগ

তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই জলপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে সমুদ্রপথে বিশ্বব্যাপী পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যেত।

সংঘাতের কারণে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কমে গেলে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেই সাধারণত ভবিষ্যৎ সংকটের ঝুঁকি বিবেচনায় তেলের দামে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৃশ্যমান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দিনে প্রায় পাঁচটিতে নেমে এসেছিল। অবশ্য নিরাপত্তার কারণে কিছু জাহাজ স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখায় প্রকৃত জাহাজ চলাচলের সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে।

এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, জাহাজের বীমা এবং জ্বালানি সরবরাহের খরচও বাড়তে পারে। ফলে সংকটের প্রভাব তেলবাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তেলের দাম বাড়ার পেছনে আরও কিছু কারণ

তেলের দামের পরবর্তী গতিপথ কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতের ওপর নির্ভর করছে না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা, ইরানের তেল রপ্তানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা—সবগুলো বিষয়ই বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রয়টার্সের তথ্য বলছে, সোমবারের মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও আগস্টে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের মাসিক গড় দাম কিছুটা নিম্নমুখী রয়েছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেও তেলের দামে চাহিদা ও সরবরাহের অন্যান্য বিষয়ও কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও কমে যায়, তাহলে বাজারে ঝুঁকির প্রিমিয়াম বাড়তে পারে। তখন তেলের ক্রেতারা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে বাড়তি অনিশ্চয়তার মূল্যও দামের মধ্যে যুক্ত করবেন।

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে

সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের আর্থিক নেটওয়ার্কে চাপ বাড়াতে ধারাবাহিকভাবে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। আরও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইরানের তেল বিক্রি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে সামরিক সংঘাত তীব্র হলে সেই অর্থনৈতিক চাপের বিপরীত একটি প্রভাবও দেখা দিতে পারে—ইরানের তেল সরবরাহ নিয়ে বৈশ্বিক বাজারে উদ্বেগ বাড়বে এবং দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

সব মিলিয়ে, আগামী দিনে তেলের বাজার কোন দিকে যাবে, তার বড় নির্ধারক হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা এগোয় কি না, নতুন করে হামলা হয় কি না এবং গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সোমবারের মূল্যবৃদ্ধি তাই শুধু একটি দিনের বাজার প্রতিক্রিয়া নয়; মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবার দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে, তারও একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category