আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি অধিনায়ক লিওনেল মেসি। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা। তাঁর আকস্মিক ঘোষণায় যেমন আবেগে ভেসেছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা, তেমনি বদলে গেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সামনের কয়েক মাসের পরিকল্পনাও।
সোমবার (৩০ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান মেসি। জাতীয় দলের হয়ে একের পর এক সাফল্যের পরও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না—নিজের বার্তাতেই সেটি স্পষ্ট করেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
মেসি লিখেছেন, দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক সিদ্ধান্ত এবং বিষয়টি এখনো তাঁর হৃদয়ের গভীরে আঘাত করছে। তবে তিনি মনে করছেন, বিদায়ের উপযুক্ত সময় এসে গেছে।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার ফুটবলের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ছিলেন তিনি। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না পাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়তে হলেও শেষ পর্যন্ত সেই আক্ষেপ ঘুচিয়েছেন মেসি। কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ—সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্জেন্টিনার সোনালি সময়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি।
মেসির বিদায়ের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আসন্ন আন্তর্জাতিক সূচিতে। পরবর্তী ফিফা আন্তর্জাতিক উইন্ডো ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত। এই সময়ে আর্জেন্টিনার সামনে চারটি প্রীতি ম্যাচ খেলার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে চীনে ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনাও ছিল এএফএর। মেসি জাতীয় দলে থাকবেন—এমন প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করেই সেই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল। তাঁর অবসরের ঘোষণার পর সেই পরিকল্পনা নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
আর্জেন্টিনার একটি ম্যাচ দেশের মাটিতে আয়োজনের সম্ভাবনাও ছিল। তবে এ ক্ষেত্রেও রয়েছে জটিলতা। বিশ্বকাপের সময়কার বিভিন্ন ঘটনার জেরে ফিফার দেওয়া শাস্তির কারণে ঘরের মাঠে দর্শকসংখ্যা সীমিত রাখার নির্দেশ রয়েছে আর্জেন্টিনার ওপর। শাস্তির আওতায় পরবর্তী দুটি হোম ম্যাচের মধ্যে প্রথমটিতে স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ দর্শক উপস্থিত থাকতে পারবেন। দ্বিতীয় ম্যাচের শাস্তি অবশ্য স্থগিত রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও মেসিকে দেশের সমর্থকদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানোর পরিকল্পনা করছে আর্জেন্টাইন ফুটবল মহল। দেশটির সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেসির জন্য আর্জেন্টিনার মাটিতে দর্শকদের সামনে বিদায় সংবর্ধনার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নির্ভর করবে মেসি নিজে কী চান, তার ওপর।
মেসির অবসরের ঘোষণার মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবলে একটি যুগের সমাপ্তির ইঙ্গিত মিলছে। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় দল যে সাফল্য পেয়েছে, সেটিই এখন নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। মেসিকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা, চাপ এবং দলের নেতৃত্ব—সবকিছুই ধীরে ধীরে অন্যদের কাঁধে চলে যাবে।
তবে বিদায়ের বার্তায় মেসি নিজের দায়িত্ববোধের কথাও স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, শুধু সাম্প্রতিক সময়ে যখন আর্জেন্টিনা সবকিছু জিতেছে তখনই নয়, তার আগের কঠিন সময়গুলোতেও জাতীয় দলের জার্সির জন্য তিনি সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে তাদের গর্বিত করা।
মেসির এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত স্থায়ী অবসর নাকি ভবিষ্যতে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁকে আবার জাতীয় দলের জার্সিতে দেখা যাবে—তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত এএফএর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মেসিকে কীভাবে বিদায় জানানো হবে এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে জাতীয় দলের নতুন অধ্যায় কীভাবে শুরু করা হবে। একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার—মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার ফুটবলের পরবর্তী পথচলা হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক বাস্তবতা।