• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
পরাজিত শক্তি ফের ষড়যন্ত্রে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে: প্রধানমন্ত্রী জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে জিয়া ও খালেদার সমাধিতে শ্রদ্ধা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নয়াপল্টন থেকে বিএনপির বর্ণাঢ্য র‍্যালি দাওয়াতের কথা বলে বাড়িতে নিয়ে মাদ্রাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ ইমামের বিরুদ্ধে স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা পথে জামায়াত-এনসিপি, জোটে কী বার্তা? গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়ল, মিলবে মাসিক মোবাইল ভাতাও জীবননগর সীমান্তে বিএসএফের গুলি, বাংলাদেশি যুবক আটক টেকনাফের পাহাড়ে ফের যৌথবাহিনীর অভিযান, বাড়ছে আতঙ্ক জামালপুরে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল দম্পতি ও শিশুসহ ৪ জনের ধামরাইয়ে দুই রাতে দুই বাসে আগুন, ক্ষতি ৫ লাখ টাকা

টেকনাফের পাহাড়ে ফের যৌথবাহিনীর অভিযান, বাড়ছে আতঙ্ক

newsline24 / ৩১ Time View
Update : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
টেকনাফের পাহাড়ে ফের যৌথবাহিনীর অভিযান, বাড়ছে আতঙ্ক
টেকনাফের পাহাড়ে ফের যৌথবাহিনীর অভিযান, বাড়ছে আতঙ্ক

কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারীদের আস্তানা নির্মূল এবং পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের ধরতে আবারও অভিযান শুরু করেছে যৌথবাহিনী। বৃহস্পতিবারের অভিযানে বন্দিশালা থেকে ৫৬ জনকে উদ্ধারের পর শনিবার সকালে একই এলাকায় নতুন করে অভিযান চালানো হয়। সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা এবং পাহাড়ে একাধিক মরদেহ পড়ে থাকার খবরকে কেন্দ্র করে এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।

শনিবার (তারিখ উল্লেখ করা হয়নি) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-নয়াপাড়া সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় যৌথবাহিনীর এ অভিযান শুরু হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা অভিযানে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), এসআরবি ও পুলিশের শতাধিক সদস্য অংশ নেন। পাহাড়ে মানবপাচারকারী চক্রের আস্তানা এবং তাদের সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করাই এ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে একই পাহাড়ি এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযানে একটি বন্দিশালা থেকে ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। অভিযান চলাকালে সশস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথবাহিনীর সদস্যদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে পাচারকারীদের ছোড়া গুলিতে সেনাবাহিনীর সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।

একজন সেনাসদস্যের প্রাণহানির ঘটনায় অভিযান ঘিরে নতুন করে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফরিদপুরের নগরকান্দায় নিজ গ্রামে সৈনিক তিতাস শেখকে দাফন করা হয়।

এদিকে বৃহস্পতিবারের অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে শুক্রবার টেকনাফ মডেল থানার প্রাঙ্গণ থেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫০ জন বাংলাদেশি নাগরিক এবং ছয়জন রোহিঙ্গা ছিলেন। তাদের উদ্ধারের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচারকারী চক্রের বন্দিদশায় থাকা মানুষের দুর্দশার চিত্র সামনে আসে।

চাকরির প্রলোভনে ডেকে নিয়ে বন্দি

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে মানবপাচারকারীদের প্রতারণার কৌশল ও নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান জানান, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কক্সবাজারে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে পাহাড়ের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে টানা আট দিন বন্দি থাকতে হয়েছে তাকে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দিদশা থেকে পালানোর জন্য দুইবার চেষ্টা করেও সফল হননি। ওই বন্দিশালায় ৫০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। তাদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। আস্তানাটি সশস্ত্র ব্যক্তিরা পাহারা দিতেন। বন্দিদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন।

এ ধরনের ঘটনায় মানবপাচারকারীরা সাধারণত চাকরি, উন্নত জীবন কিংবা বিদেশে যাওয়ার সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়। পরে জিম্মি করে অর্থ আদায় অথবা সাগরপথে পাচারের চেষ্টা করে। টেকনাফ ও উখিয়া উপকূলীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সীমান্তসংলগ্ন পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে।

পাহাড়ে মরদেহ থাকার খবরে বাড়ছে উদ্বেগ

যৌথবাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি পাহাড়ে একাধিক মরদেহ পড়ে থাকার খবরও নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম জানান, দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে নিহত ব্যক্তিরা ডাকাত দলের সদস্য, নাকি বন্দিশালা থেকে পালিয়ে যাওয়া ভুক্তভোগী, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি তিনি।

পাহাড়ে মরদেহ থাকার খবর প্রকাশিত হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেগুলোর অবস্থান ও পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ঘটনাটিকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের পরই এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তাহীনতা

পাহাড়ে ধারাবাহিক অভিযান, গোলাগুলির শব্দ এবং সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন পাহাড়সংলগ্ন লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা। ক্যাম্পটির বড় একটি অংশ পাহাড়ের কাছাকাছি অবস্থিত। সেখানে প্রায় তিন থেকে চার হাজার রোহিঙ্গার বসবাস।

ক্যাম্পের মাঝি নবী হোসেন বলেন, পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় প্রায় চার হাজার মানুষের বসতি রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর থেকে ক্যাম্পের বাসিন্দারা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। গত কয়েক দিন ধরেই পাহাড়ে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে।

ক্যাম্পের বাসিন্দা মরিয়ম খাতুন (৫০) জানান, শনিবার সকাল থেকেই পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চলাচল বেড়েছে। এর আগের কয়েক দিনও পাহাড়ের দিক থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। এতে নারী, শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

মানবপাচার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে

টেকনাফ পরিদর্শনকালে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, সাগরপথে মানবপাচার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাহাড়ে একাধিক মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়ার কথাও জানান তিনি।

পুলিশ সুপার বলেন, মরদেহ উদ্ধারের আগে সেখানে আদৌ মরদেহ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা, সশস্ত্র অপরাধীদের অবস্থান এবং বন্দিশালা পরিচালনার বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষ করে চাকরির প্রলোভনে মানুষকে আটকে রেখে সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতির অভিযোগ পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।

এখন যৌথবাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের শনাক্ত করা, বন্দিশালার সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পাহাড়সংলগ্ন লেদা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাও জরুরি হয়ে উঠেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category