আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ১১ দলীয় ঐক্যে একসঙ্গে থাকলেও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে নয়, বরং নিজ নিজ দলীয় পরিচয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দল দুটি। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা এবং নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরুর নির্দেশনাও দিয়েছে তারা। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, পারস্পরিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে জোটের ভাঙন কিংবা রাজনৈতিক দূরত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের দাবি, জাতীয় রাজনীতি, জুলাই বিপ্লবের চেতনা, গণহত্যার বিচার, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রশ্নে দুই দলের অবস্থান এখনো অভিন্ন। নির্বাচনে আলাদা কৌশল নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো, দলীয় পরিচিতি প্রতিষ্ঠা এবং তৃণমূল পর্যায়ে জনসমর্থন বিস্তৃত করা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এর মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী সম্ভাব্য একক প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করে তাদের নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। একই পথে হাঁটছে এনসিপিও। দলটি বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি ঘিরে আলোচনা
জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে দূরত্ব তৈরির আলোচনা নতুন নয়। কয়েক মাস ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন রয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের একটি লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। জোটের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ দুই দলের সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে আনছেন।
তবে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এ ধরনের আলোচনা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য কিংবা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির কোনো ফাটল বা দূরত্ব নেই। দুই দলের মধ্যে যেসব পার্থক্য দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো মূলত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশলের অংশ।
আখতার হোসেনের ভাষ্য, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা, গণহত্যার বিচার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাদের ঐক্য অটুট রয়েছে। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির নিজস্ব পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি রয়েছে। দলটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে জনগণের আরও কাছাকাছি যেতে এবং নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে চায়।
তিনি আরও বলেন, যারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না এবং গণভোটের রায় উপেক্ষা করছে, তারাই জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে ফাটল রয়েছে বলে প্রচার করছে। এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে আখতার হোসেনের বক্তব্য, এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক রণকৌশল অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেবে। জামায়াতও তাদের আদর্শ ও সাংগঠনিক পরিকল্পনা অনুসারে নির্বাচন করবে। এতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। একইভাবে জোটের কোনো কর্মসূচিতে কোনো শীর্ষ নেতা উপস্থিত থাকতে না পারলেই সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয় বলে মনে করেন তিনি।
দূরত্বের গুঞ্জন উড়িয়ে দিচ্ছে জামায়াতও
এনসিপির মতো জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও দুই দলের মধ্যে দূরত্বের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সম্প্রতি বলেন, একটি লংমার্চে নাহিদ ইসলাম অংশ নিতে পারেননি। তিনি অসুস্থ থাকতে পারেন কিংবা অন্য কোনো সমস্যার কারণে কর্মসূচিতে উপস্থিত হতে পারেননি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে প্রচার করা অযৌক্তিক।
তার দাবি, জামায়াত ও এনসিপি সংসদের ভেতরে এবং বাইরে একসঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। দুই দলের মধ্যে বিন্দুমাত্র দূরত্ব নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও সেটি জোটের জন্য কোনো সমস্যা তৈরি করছে না।
হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত কোনো বিচ্ছেদের ইঙ্গিত নয়। প্রয়োজনে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আলোচনার দরজা সব সময় খোলা। তার মতে, কিছু গণমাধ্যম, সরকারদলীয় ব্যক্তি এবং জুলাইবিরোধী পক্ষ দুই দলের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করছে।
এনসিপির সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি সম্প্রতি নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনে মনোযোগ দিয়েছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি পুনর্বিন্যাস, শীর্ষ নেতাদের দায়িত্ব ও পদ-পদবিতে পরিবর্তন এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া নেতাদের আবারও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দলটি সাংগঠনিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
একই সঙ্গে জোটের বাইরে গিয়ে একক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, বড় সভা-সমাবেশ আয়োজন এবং স্থানীয় নির্বাচনে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতিও দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন দল হিসেবে এনসিপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজস্ব ভোটব্যাংক তৈরি করা। জোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতেও দলটির দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়বে। অন্যদিকে জামায়াতের জন্যও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাংগঠনিক প্রভাব ও জনসমর্থন যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
তবে জোটের কয়েকজন নেতার মধ্যে এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তাদের মতে, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি ঐক্যের বার্তা দেয়। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচনে পৃথক প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের আলোচনা বাড়বে।
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন ঘিরে হিসাব-নিকাশ
জামায়াত ও এনসিপির পৃথক নির্বাচনি প্রস্তুতির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। দুই দলই রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এতে জোটগত নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জামায়াতে ইসলামী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম।
এদিকে এনসিপিও নিজেদের প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনি পরিকল্পনা সাজিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে প্রথমে ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং উত্তরে আরিফুল ইসলামের নাম সামনে এসেছিল। পরে নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভোটার এলাকার পরিবর্তন ঘটে। সেপ্টেম্বরে আসিফ মাহমুদ ঢাকা উত্তর সিটির ভোটার হন এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা দক্ষিণ সিটির ভোটার হন।
এরপর এনসিপি চূড়ান্তভাবে জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দলটির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
দুই দলের প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাজধানীর নির্বাচনি রাজনীতিতে পৃথক মেরুকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদিও জোটের কোনো কোনো নেতার ধারণা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে জনপ্রিয় প্রার্থীকে কেন্দ্র করে সমঝোতা হলে জোটের সম্মিলিত ভোট কাজে লাগানো সম্ভব। এতে নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
তাদের মতে, আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনি সমীকরণ বিবেচনায় সমঝোতার পথ খোলা থাকতে পারে। বিশেষ করে দুই দলের ভোটারদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে জোটের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।
একক নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অনড় এনসিপি
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনও দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। কেউ মনে করছেন, জোটগতভাবে নির্বাচন করলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। আবার কেউ মনে করছেন, স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাই দলের জন্য বেশি কার্যকর হবে। তবে দলের ভেতরে ভিন্নমত থাকাকে তারা ইতিবাচকভাবেই দেখছেন।
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সম্প্রতি তিনি বলেন, সব ধরনের মতামতকে সম্মান জানানো হলেও এনসিপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, দলটি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
তার প্রশ্ন, জামায়াতে ইসলামীও যখন নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এনসিপির একই সিদ্ধান্তের কারণে জোটের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথা কেন বলা হচ্ছে?
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত ও এনসিপির পৃথক নির্বাচনি প্রস্তুতি ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে দুই দল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনি সক্ষমতা যাচাই করতে চায়, অন্যদিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ইস্যুতে ঐক্য ধরে রাখার কথাও বলছে। তবে নির্বাচনের মাঠে প্রার্থী, আসন ও ভোটের হিসাব-নিকাশ যত স্পষ্ট হবে, জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের প্রকৃত চিত্রও তত পরিষ্কার হয়ে উঠবে।
এখন দেখার বিষয়, স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা পথ বেছে নেওয়ার পরও জামায়াত ও এনসিপি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য কতটা কার্যকরভাবে ধরে রাখতে পারে। নাকি নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ভবিষ্যতে দুই দলের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।