ভারতীয় ইসলামি বক্তা ও ধর্মপ্রচারক ডা. জাকির নায়েককে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে মালয়েশিয়া। তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি নয়াদিল্লিকে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, জাকির নায়েককে প্রত্যর্পণের বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকার আপাতত আগের সিদ্ধান্তেই অটল রয়েছে।
মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম নিউ স্ট্রেইটস টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে এক লিখিত জবাবে এ অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, ২০১০ সালের ভারত-মালয়েশিয়া প্রত্যর্পণ চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ১৯৯২ সালের প্রত্যর্পণ আইন পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমান আইনি কাঠামো ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিধান বিবেচনায় নিয়ে জাকির নায়েককে প্রত্যর্পণ না করার অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, এ বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন মালয়েশিয়া পায়নি। ফলে জাকির নায়েককে ভারতের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে নতুন করে কোনো প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার তথ্যও নেই।
সংসদ সদস্য দাতুক ড. আহমাদ মারজুক শারির এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি ভারতের পক্ষ থেকে সর্বশেষ কখন আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের আবেদন জানানো হয়েছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। পাশাপাশি ভারতের দেওয়া তথ্য-প্রমাণ মালয়েশিয়ার প্রচলিত আইন এবং দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্ত পূরণ করে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয় বলে উল্লেখ করেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারত প্রথমবার ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে জাকির নায়েককে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। এর দুই বছরের বেশি সময় পর, ২০২০ সালের ২৯ মে কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায় নয়াদিল্লি। তবে এসব উদ্যোগের পরও তাকে ভারতের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে মালয়েশিয়ার অবস্থানে পরিবর্তন আসেনি।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠককে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। গত সেপ্টেম্বরে দুই নেতার বৈঠকে জাকির নায়েকের প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হলে মালয়েশিয়ার বিরোধী দলের নেতারা সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চান।
এ প্রসঙ্গে পাসের মহাসচিব দাতুক সেরি তাকিউদ্দিন হাসান সংসদে জানতে চান, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে জাকির নায়েকের বিষয়ে ঠিক কী আলোচনা হয়েছিল এবং এ নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না। ভারতের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্য-প্রমাণ মালয়েশিয়ার প্রত্যর্পণ আইনের শর্ত পূরণ করে কি না, সে বিষয়েও সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান জানতে চান তিনি।
জাকির নায়েককে ফেরত চাওয়ার পেছনে ভারতের অভিযোগের মধ্যে অর্থপাচার ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিষয় রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ভারত তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে চায়। তবে কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশের কাছে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগ থাকাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিধান, উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ এবং প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনি শর্তও বিবেচনায় নিতে হয়।
জাকির নায়েকের বিষয়টি ভারত ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক ও আইনি আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হয়ে রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও কোনো ব্যক্তিকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে হলে চুক্তির নির্দিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হয়। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা এবং উপস্থাপিত প্রমাণের যথার্থতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্যে তাই ভারতের প্রত্যর্পণ প্রচেষ্টার বিষয়ে দেশটির বর্তমান অবস্থান আবারও পরিষ্কার হয়েছে। জাকির নায়েককে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি এবং নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদনও পাওয়া যায়নি। ফলে এ মুহূর্তে তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।