নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোরে তিব্বত থেকে নেপালের দিকে প্রবাহিত ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত দেখা দিলে নদীর আশপাশের গ্রাম, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন নেপালি কর্মকর্তারা। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত তুষার গলার পানি ভোতে কোশি নদীতে প্রবেশ করায় আকস্মিকভাবে পানির উচ্চতা ও স্রোত বেড়ে গিয়ে এই বন্যা সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ ও ব্যাপ্তি নির্ধারণে এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সীমান্তের নেপাল ও তিব্বত—দুই অংশেই নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যার পানির প্রবল স্রোতে নদীর নিম্নাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকা প্লাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, স্রোতের পানি গ্রাম ও বিভিন্ন স্থাপনার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
দুর্যোগের কারণে রসুয়া অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কাঠমান্ডুর সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়কও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ—দুই কাজই কঠিন হয়ে পড়েছে।
কাঠমান্ডুতে অবস্থানরত চীনা ব্যবসায়ী ইয়ি লিয়াং বিবিসিকে জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠানের সাতটি কনটেইনার ট্রাক ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। প্রতিটি ট্রাকেই নেপালি কর্মীরা ছিলেন। বন্যার পর থেকে তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওই কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিব্বতের অংশেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা গুয়ান দাওশুয়ান জানিয়েছেন, বুধবার সকালে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়েছেন। তার স্ত্রী তিব্বতে সড়ক ও সেতু নির্মাণে কাজ করা একটি রাষ্ট্রীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে আটকে পড়া বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার তৎপরতায় হেলিকপ্টার ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রবল বাতাসের কারণে আকাশপথে অভিযান পরিচালনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া যুক্ত হওয়ায় উদ্ধারকারীদের কাজ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রসুয়া জেলায় দায়িত্ব পালনরত ১৩ জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্যেরও এখন পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আরও কয়েক ডজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ করছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নদীর তীরবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে মেডিকেল টিম, স্কাউট এবং রেড ক্রসের সদস্যদের সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। দুর্গত এলাকায় আটকে পড়াদের কাছে দ্রুত চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
রসুয়া ও ভোতে কোশি নদীসংলগ্ন অঞ্চল আগে থেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত, তুষার গলা পানি এবং হিমবাহসংক্রান্ত ঘটনাগুলো নদীর পানির প্রবাহে দ্রুত পরিবর্তন আনতে পারে। এর আগে গত বছরও রসুয়া এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। চীনের অংশে একটি হিমবাহ ভেঙে যাওয়ার পর ওই বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল বলে তখন জানানো হয়েছিল।
নেপালের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বুধবারের দুর্যোগের ব্যাপ্তি গত বছরের বন্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গত এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের আগে মোট প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া কঠিন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে।