ময়মনসিংহের ফুলপুরে নিখোঁজের ২৫ দিন পর রাশেদুল ইসলাম (১৯) নামের এক তরুণের কঙ্কাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। একটি জঙ্গল থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হাড়, মাথার খুলি, প্যান্ট ও গেঞ্জি উদ্ধার করা হয়। পরনের পোশাক দেখে কঙ্কালটি নিজের ছেলে রাশেদুলের বলে শনাক্ত করেন তাঁর বাবা মো. শাহজাহান।
রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রামের ‘গারোর ভিটা’ এলাকার জঙ্গল থেকে এসব উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন জসিম উদ্দিন (২৪), রফিক (২৮) ও মোজাম্মেল হোসেন (২৭)।
রাশেদুল ফুলপুর উপজেলার কৃষ্ণ মহেশপট্টি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন। তবে ইটভাটায় কাজ না থাকায় প্রায় দেড় মাস ধরে বাড়িতে ছিলেন। এ সময় পাশের এলাকার জসিম, রফিক ও মোজাম্মেলের সঙ্গে তাঁর চলাফেরা ও আড্ডা বেড়ে যায়। তিনজনের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক হিসেবেও কাজ করতেন রাশেদুল।
পুলিশ ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট রাত নয়টার দিকে মুঠোফোনে রাশেদুলকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান জসিম উদ্দিন। এরপর থেকেই তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন সকালে রাশেদুলের মুঠোফোন নম্বর থেকে তাঁর বাবা শাহজাহানের কাছে ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্তে এক নারীর কণ্ঠে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দুই ঘণ্টার মধ্যে টাকা দেওয়ার কথা বলে একাধিকবার ফোন ও খুদেবার্তা পাঠানো হয়।
ঘটনার দিনই ফুলপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শাহজাহান। পরে জসিম এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। ২৫ আগস্ট এ ঘটনায় ফুলপুর থানায় অপহরণের মামলা করা হয়। মামলায় জসিমকে প্রধান আসামি করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছিল।
মামলার তদন্তের একপর্যায়ে রোববার দুপুরে নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জ রেলস্টেশন এলাকা থেকে জসিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই গ্রামের রফিক ও মোজাম্মেলকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, জসিমের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার রাতে চন্দ্রপুর গ্রামের ‘গারোর ভিটা’ এলাকায় অভিযান চালানো হয়। জঙ্গলের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে বিভিন্ন হাড়, একটি মাথার খুলি, প্যান্ট ও গেঞ্জি পাওয়া যায়। পরে পোশাক দেখে সেগুলো রাশেদুলের বলে শনাক্ত করেন তাঁর বাবা।
রাশেদুলের বাবা শাহজাহান অভিযোগ করেছেন, কয়েক দিন আগে রাশেদুল, রফিক ও মোজাম্মেল একসঙ্গে একটি শসাখেতে কাজ করেছিলেন। কাজ শেষে রফিক ৫০০ টাকা পারিশ্রমিক পেলেও রাশেদুলকে দেওয়া হয় ১০০ টাকা। বাকি টাকা দিয়ে রফিক ইয়াবা কিনে সেবন করেন বলে অভিযোগ করেন শাহজাহান। পরে রাশেদুলের মুঠোফোন নষ্ট হয়ে গেলে পাওনা টাকা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। তাঁর ধারণা, ওই বিরোধের জেরেই তিনজন মিলে রাশেদুলকে হত্যা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাশেদুলকে শ্বাসরোধে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে তাঁরা একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। ফলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফুলপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জিকরুল ইসলাম বলেন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে শ্বাসরোধে হত্যার তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে। হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ যাচাই করা হচ্ছে।
উদ্ধার করা হাড়ের অংশগুলো পরিচয় নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
নিখোঁজ হওয়ার পর রাশেদুলের পরিবারের কাছে মুক্তিপণের ফোন আসা এবং পরে জঙ্গলে তাঁর কঙ্কাল ও পোশাক উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে উদ্ধার করা দেহাবশেষ রাশেদুলের কি না, তা ডিএনএ পরীক্ষার পর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি হত্যার পেছনে প্রকৃত কারণ কী এবং ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না, তদন্তে সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।