টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ১০ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক আল আমিনের বিরুদ্ধে। পরিবারের অভিযোগ, প্রায় তিন মাস ধরে ভয়ভীতি দেখিয়ে শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে। সর্বশেষ মাদরাসায় ফেরার পর ১১ দিনের মধ্যে আট দিন তাকে নির্যাতন করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে এ ঘটনা জানাজানি হলে শিশুটির মা, নানা ও মামা মাদরাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করেন। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে স্থানীয় লোকজন মাদরাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান এবং শিক্ষক আল আমিনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মির্জাপুর উপজেলা সদরের বাইপাস বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি মার্কেটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা ভাড়া নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর আগে ‘মারকাজুল উম্মাহ মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন ফতেপুর ইউনিয়নের পারদিঘী গ্রামের হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান। প্রায় তিন বছর আগে ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন আল আমিন। তিনি ভাওড়া ইউনিয়নের শ্বশ্বধরপট্রি গ্রামের আব্দুল মালেক মিয়ার ছেলে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জামুর্কী ইউনিয়নের পাকুল্যা সদরের ১০ বছর বয়সী ওই শিশু মাদরাসার নাজেরা বিভাগে ভর্তি হয়। আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে সেখানেই থাকত সে। পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পর থেকেই বিভিন্নভাবে ফুসলিয়ে ও ভয় দেখিয়ে শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতেন শিক্ষক আল আমিন।
নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটির পেটে ব্যথা এবং পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্তপাত শুরু হয়। অসুস্থতার কথা সে মাকে জানালে মা তাকে ছুটিতে বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে এক সকালে শিশুটির নানা আজিজুর রহমান বাড়ির টয়লেটে রক্ত দেখতে পান এবং বিষয়টি মেয়েকে জানান। তবে ভয় ও আতঙ্কে শিশু তখনও নির্যাতনের বিষয়টি পরিবারের কাছে প্রকাশ করেনি।
এরপর মা ছেলেকে জামুর্কী, মির্জাপুর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করান। চিকিৎসা শেষে প্রায় ১১ দিন আগে তাকে আবার মাদরাসায় রেখে যান। পরিবারের দাবি, ওই ১১ দিনের মধ্যে আট দিনও শিশুটিকে নির্যাতন করা হয়। এতে তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে সে আবার মাকে বিষয়টি জানায় এবং মাদরাসায় থাকতে অস্বীকৃতি জানায়।
শিশুটির মা জানান, ছেলে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘মা, এখানে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার পেট ব্যথা হচ্ছে। আমাকে নিয়ে যাও। আমি এখানে থাকতে পারব না।’ ছেলের অসুস্থতার কথা জানিয়ে তিনি মাদরাসায় গেলে অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে গ্যাস্ট্রোলিভারের চিকিৎসক দেখানোর পরামর্শ দেন বলে দাবি করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মির্জাপুর সদরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে শিশুটির বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়। পরিবারের দাবি, চিকিৎসকের কাছে শিশুটি নির্যাতনের কথা জানায় এবং পরীক্ষার পর চিকিৎসকও বিষয়টি তাদের অবহিত করেন। এরপরই পরিবার বিষয়টি প্রকাশ্যে এনে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
শুক্রবার সকালে শিশুটির মা, নানা ও মামা মাদরাসায় গিয়ে বিচার দাবি করলে অভিযুক্ত শিক্ষক ও অধ্যক্ষের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন মাদরাসায় জড়ো হন। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা শিক্ষক আল আমিনকে মারধর করেন।
এ সময় মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে জনতার ওপর শিক্ষার্থীদের দিয়ে হামলার চেষ্টা করানোর অভিযোগও ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি মাদরাসার গেট বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের লাঠি হাতে জনতার দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পরে অধ্যক্ষ ও অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী শিশুর নানা আজিজুর রহমান বলেন, এত ছোট একটি শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তিনি অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
শিশুটিও জানিয়েছে, গত তিন মাস ধরে শিক্ষক তাকে ভয় দেখিয়ে ও ফুসলিয়ে নির্যাতন করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে পেটে ব্যথার পাশাপাশি পায়খানার রাস্তা দিয়ে নিয়মিত রক্ত পড়ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষক আল আমিন বলেন, তিনি নির্দোষ। তার দাবি, ওই শিশু মিথ্যা কথা বলছে এবং শেষ বিচারের মালিক আল্লাহ।
অন্যদিকে মাদরাসার অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষককে আর প্রতিষ্ঠানে রাখা হবে না। জনতার ওপর শিক্ষার্থীদের হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, কয়েকজন ব্যক্তি তার গলা চেপে ধরেছিলেন, এ কারণেই তিনি ওই নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, অধ্যক্ষ ও অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুটির মা বাদী হয়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। অভিযোগের তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হবে।