কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে উৎপাদন বাড়ানোর পর আবারও বড় ধাক্কা খেয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কারিগরি ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়; বেড়েছে লোডশেডিং।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দিবাগত রাত ১২টার দিকে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে সমস্যা দেখা দেয়। এর আগে গত এক মাস ধরে কয়লা সংকটের কারণে কেন্দ্রটি সীমিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল।
গত ৭ আগস্ট ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কেন্দ্রটির উৎপাদন কমে যায়। পরে কয়লা সরবরাহ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। গত মাসের শেষ দিকে দিনের বেলায় কেন্দ্রটি প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সরবরাহ বেড়ে দাঁড়াচ্ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর উৎপাদন আরও বাড়তে শুরু করে। গতকাল রাতে কেন্দ্রটির উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু রাত ১২টার দিকে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উৎপাদন নেমে এসেছে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে।
ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। সেখানে ৮০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রটি অতীতে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেছে।
কেন্দ্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বয়লারে সমস্যা দেখা দেওয়ায় একটি ইউনিট বন্ধ হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ বয়লার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। এরপর মেরামতের কাজ শুরু হবে। ফলে দ্রুততম সময়ে উৎপাদন আগের পর্যায়ে ফিরবে না; স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
এদিকে আদানির কেন্দ্রের সমস্যার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতিও চাপের মধ্যে রয়েছে। পিডিবি সূত্র বলছে, দুই মাসের বেশি সময় ধরে দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোরও সবগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। কয়লার স্বল্পতার পাশাপাশি বিভিন্ন কেন্দ্রে কারিগরি সমস্যাও রয়েছে। পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কিছুদিন ধরে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। একই এলাকায় আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লার সংকট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লার সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে। ফলে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদ্যুৎ না পাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ বাড়ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও তাতে ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে দিনের উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিংও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে বেলা ৩টার দিকে। ওই সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোট ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। আজ ছুটির দিন সকালেও সারাদেশে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কত দ্রুত মেরামত করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়, তার ওপর সামনের কয়েক দিনের সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে। একই সময়ে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে চাহিদা বাড়ার সময় লোডশেডিং আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।