গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে মুমূর্ষু স্ত্রীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করলে মরদেহ ফেলে পালানোর চেষ্টা করেছেন স্বামী। পরে নিজ এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয়রা তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বামীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনা ঘটে। আটক ব্যক্তির নাম মোরসেলিম আকাশ সিয়াম। তিনি উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মাজহারুল ইসলাম মিতুর ছেলে।
নিহত শাহিনা আক্তারের বয়স ২২ বছর। তিনি সাদুল্লাপুর উপজেলার ইদিলপুর গ্রামের মৃত শাহাজাদা মিয়ার মেয়ে। শাহিনা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার চার বছর ও এক বছর বয়সী আয়াশ ও আয়াত নামে দুটি ছেলে সন্তান রয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে সিয়াম নিজেই একটি প্রাইভেটকার চালিয়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রী শাহিনাকে পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ইসিজি করার পর শাহিনাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চিকিৎসক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার পরপরই সিয়াম হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি প্রাইভেটকার নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। এ সময় দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা তাকে আটকানোর চেষ্টা করেন। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে শাহিনার মরদেহ থানায় নেওয়া হয়।
অন্যদিকে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সিয়াম নিজের এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। তারা তাকে আটক করে পুলিশে খবর দেন। পরে পলাশবাড়ী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সিয়ামকে হেফাজতে নেয়।
হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সচালক হৃদয় মণ্ডল বলেন, চিকিৎসক শাহিনাকে মৃত ঘোষণা করার পর সিয়ামের আচরণ উপস্থিত লোকজনের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি প্রাইভেটকার নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান।
এদিকে শাহিনার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তাকে হত্যা করে মরদেহ হাসপাতালে রেখে পালানোর চেষ্টা করেছেন সিয়াম। নিহতের মা রহিমা বেগমের অভিযোগ, সিয়াম মাদকাসক্ত এবং বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শাহিনাকে মারধর করতেন। ঘটনার দিনও শাহিনাকে মারধর করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শাহিনার চাচা মাজিদুর রহমানও একই অভিযোগ করেছেন। তার ভাষ্য, কয়েক বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের পর শাহিনা ও সিয়াম পালিয়ে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। মাদকাসক্তির কারণে সিয়াম প্রায়ই শাহিনাকে মারধর করতেন এবং পারিবারিক বিরোধ নিয়ে একাধিকবার সালিশও হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, শাহিনার মৃত্যুর ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে।
তবে পরিবারের এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের আগে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. শামা তাবাসসুম জানান, শাহিনাকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। তার গলায় আঘাতের চিহ্নও দেখা গেছে।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরোয়ারে আলম খান বলেন, স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে পালানোর চেষ্টার ঘটনায় মোরসেলিম আকাশ সিয়ামকে আটক করা হয়েছে। মরদেহের বিভিন্ন স্থানে পুরোনো একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। গলাতেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে গলায় ফাঁস লাগার বিষয়টি ধারণা করা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
শাহিনার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে আইনগত প্রক্রিয়ায় মরদেহের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পুলিশের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পরিবারের করা অভিযোগ ও হাসপাতাল থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্যও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।