কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় অস্ত্র হাতে থাকা ১৯ জন বহিরাগতকে শনাক্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংঘর্ষের সময় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণ করে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, সংঘর্ষের পুরো ঘটনা এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রমাণ ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় এক ছাত্রদল নেতাকে ছাত্রশিবিরের এক নেতা থাপ্পড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পরে বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শুরু হয় ধস্তাধস্তি ও সংঘর্ষ। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকায় দুই সংগঠনের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন।
সংঘর্ষের পর শনিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীকে দেশীয় ধারালো অস্ত্র হাতে দেখা গেছে বলে ভিডিও ও ছবিতে উঠে এসেছে। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা শহীদ জিয়াউর রহমান হলসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন।
ভিডিও ফুটেজ ও ছবির ভিত্তিতে অস্ত্র হাতে শনাক্ত হওয়া ১৯ জনের মধ্যে রয়েছেন পদমদি গ্রামের বিএনপিকর্মী মানওয়ার, যুবদলের হামিম, সানওয়ার ও রাজিব, পদমদির ইমন বিশ্বাস, শীতলডাঙার শিমুল, জাঙ্গালিয়া পশ্চিমপাড়ার সাগর খন্দকার, আনন্দনগরের নাহিদ ও বাধন, শেখপাড়ার জিম মন্ডল, নিবিড় মন্ডল, সাইফুল, হিমেস, তৌহিদ, রাতুল জোর্দার ও সোহাগ। এছাড়া ডিএম কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হৃদয়, মদনডাঙা হাই স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইসুল এবং চরশান্তিডাঙার মিকদাদকেও শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে শনাক্ত ব্যক্তিদের একজন পদমদি গ্রামের বিএনপিকর্মী মানওয়ার অস্ত্র বহনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি ঘটনাস্থলে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করেননি। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা উসকানি দেওয়ায় তাদের ধাওয়া করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। ওই সময় পাঁচ-ছয়টি ইউনিয়নের বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন জানিয়ে মানওয়ার বলেন, তাদের হাতে লাঠি ছিল, কোনো অস্ত্র ছিল না।
ক্যাম্পাসে বহিরাগত নিয়ে আসার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাফিজ আহমেদ। তিনি বলেন, ছাত্রদল কোনো বহিরাগতকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেনি। ঘটনাস্থলে বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ এসে থাকতে পারেন। সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে এবং তাঁরা তদন্তের ওপর আস্থাশীল।
এদিকে ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, অস্ত্রসহ বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের বিষয়টি পুলিশ অনুসন্ধান করছে। আহত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিম বলেন, তদন্তের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন জায়গায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষের কারণ, বহিরাগতদের প্রবেশ এবং ঘটনার সময় তাদের ভূমিকা—সবকিছুই তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ঘটনার পর রাত থেকেই পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পুরো ক্যাম্পাসে টহল জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে এবং বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান জানান, সংঘর্ষের কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিকে ৭২ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় এখন মূলত তিনটি বিষয় তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে—সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে, ক্যাম্পাসে বহিরাগতরা কীভাবে প্রবেশ করল এবং অস্ত্র হাতে যাদের শনাক্ত করা হয়েছে, সংঘর্ষে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসব প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।