পদ্মা নদীর পানি বাড়তে থাকায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দুই ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানির নিচে চলে গেছে অধিকাংশ রাস্তাঘাট। ফলে নৌকা ও ডিঙি নৌকাই এখন অনেক এলাকার বাসিন্দাদের চলাচলের প্রধান ভরসা।
বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুই ইউনিয়নের ২৫টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এসব বিদ্যালয় ভবন বন্ধ করা হয়নি। পানিবন্দি পরিবারগুলোর প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যালয়গুলো খোলা রাখা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভারতের ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ার পর উজান থেকে নেমে আসা পানি এবং বৃষ্টির পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হওয়ায় নদীর পানি দ্রুত বেড়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, উজানের ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতই পদ্মার পানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এক সপ্তাহে নদীর পানি প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ওই পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপৎসীমার প্রায় ৯২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বর্তমানে বিপৎসীমা নির্ধারিত রয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ মিটার এবং নদীর পানি ১৩ মিটারের আশপাশে রয়েছে।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মন্ডল জানান, তাঁর ইউনিয়নের ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। যেসব পরিবারের ঘরে পানি প্রবেশ করেছে, তাদের নৌকায় করে তুলনামূলক উঁচু ও নিরাপদ স্থানে নেওয়া হচ্ছে। বেশ কিছু বাড়িঘর পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে গেছে।
অন্যদিকে চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মান্নান উদ্দিন বলেন, তাঁর ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ইউনিয়নের প্রায় সব রাস্তাই পানিতে ডুবে গেছে। পানি বাড়তে থাকলে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে আরও অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
দুর্গত মানুষের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। তবে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
বন্যার প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুই ইউনিয়নে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এসব জমিতে আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল ছিল। পানি আরও বাড়লে কৃষির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শিক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চরাঞ্চলের অনেক এলাকা ও সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ রেখেছেন। সরাসরি শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পানি ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পদ্মার পানি বেড়েছে। দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারীর নিম্নাঞ্চল প্রতিবছরই প্লাবিত হয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশঙ্কা, নদীর পানি আরও বাড়লে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা, কৃষি ক্ষতি ও জনদুর্ভোগও বাড়তে পারে।