ভয়াবহ দুর্যোগের পর নেপালের মানুষের জন্য ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ পাঠানো হলেও অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় দেশটির সীমান্ত থেকে কিছু বেসরকারি ত্রাণবাহী চালান ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নেপালের কাস্টমস কর্তৃপক্ষের এ অবস্থানকে ঘিরে ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলেও দেশটির সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা দেশবিরোধী উদ্দেশ্য নেই; বরং বিদেশি সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে নেপালের প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে।
দুর্যোগের পর ভারত সরকার নেপালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জরুরি সহায়তা পাঠিয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশটি প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধ, জরুরি খাদ্য, তাবু, অস্থায়ী আশ্রয় তৈরির কিট, কম্বল, স্লিপিং ব্যাগ, পানি পরিশোধনের সরঞ্জাম এবং জেনারেটর সেট।
শুধু ত্রাণসামগ্রী নয়, উদ্ধার ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্যও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাঠিয়েছে ভারত। এর মধ্যে একটি বিশেষ টানেল উদ্ধারকারী দল রয়েছে। পাশাপাশি ২৩০ ফুট দীর্ঘ একটি মডুলার স্টিল বেইলি ব্রিজ নির্মাণের সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। আরও ১৭টি সেতু নির্মাণের সরঞ্জাম ১৬টি ট্রাক ও চারটি বিমানে করে নেপালে পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত সরকারের পাশাপাশি দেশটির সাধারণ নাগরিক ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও নেপালের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ত্রাণ সংগ্রহ ও পাঠানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের কিছু চালান নেপাল সীমান্তে গিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সীমান্তে নেপালের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কিছু বেসরকারি ত্রাণবাহী গাড়িকে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া বিদেশ থেকে ত্রাণসামগ্রী এনে সরাসরি বিতরণ করা যাবে না। ত্রাণ দিতে হলে নেপালের অভ্যন্তর থেকেই সামগ্রী সংগ্রহ করে বিতরণের কথাও কিছু বেসরকারি সংস্থাকে জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ভারতের উত্তরপ্রদেশের যুবক রতন ধিল্লোর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য, ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সময়ে নেপালকে সহায়তা করে আসছে। বেসরকারি উদ্যোগে পাঠানো ত্রাণ সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে তিনি অপমানজনক হিসেবে দেখছেন।
নেপালের সিনিয়র সাংবাদিক গজেন্দ্র বুদ্ধঠোকির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিদেশি কোনো দেশ বা সংস্থা থেকে সহায়তা কিংবা ত্রাণসামগ্রী নেপালে প্রবেশ করাতে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কাস্টমসের ছাড়পত্র পাওয়ার আগে নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অথবা জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।
তার ভাষ্য, কিছু বেসরকারি ত্রাণবাহী চালানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা কাগজপত্র না থাকায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সেগুলো গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে সীমান্তে পৌঁছানোর পর চালানগুলো আটকে যায় এবং সংশ্লিষ্টদের সেগুলো ফিরিয়ে নিতে হয়।
বুদ্ধঠোকি আরও জানান, নেপাল সরকার ব্যক্তিগত বা বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে সরাসরি ত্রাণ বিতরণের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় তহবিল অথবা সরকার নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছে দেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। দুর্যোগের সময়ে ত্রাণের হিসাব, প্রয়োজন নির্ধারণ এবং বিতরণে সমন্বয় রাখার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত।
ভারত সরকারের পাঠানো ত্রাণ ও সরঞ্জামের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থার পাঠানো চালানের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত পার্থক্য থাকতে পারে। সরকারি পর্যায়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকায় বড় ধরনের ত্রাণ চালান প্রবেশের ক্ষেত্রে আলাদা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে ব্যক্তি বা বেসরকারি সংগঠনের পাঠানো ত্রাণে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথিপত্র না থাকলে কাস্টমস পর্যায়ে তা আটকে যেতে পারে।
নেপালের কাস্টমস বিভাগের অবস্থানও মূলত এমনই—বিদেশি ত্রাণসামগ্রী আটকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি। বরং রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইন এবং প্রশাসনিক বিধি মেনেই অনুমোদনবিহীন বেসরকারি চালান সীমান্তে আটকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ফলে ভারতীয় বেসরকারি উদ্যোগে পাঠানো ত্রাণ সীমান্ত থেকে ফেরত যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তার পেছনে মূলত প্রশাসনিক অনুমোদন ও ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেপালের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া বিদেশি ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ না দেওয়ার নীতিই এসব চালান আটকে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।