রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনের আশপাশেই দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগ উঠেছে। কার্যালয় চত্বরের ভেতরে থাকা কয়েকটি দোকানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদকের কারবার। পাশের ড্রেনগুলোতে পড়ে রয়েছে ফেনসিডিলের অসংখ্য খালি বোতল। সরকারি দপ্তরের কর্মচারী, দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রকাশ্যেই চলছে এসব কর্মকাণ্ড। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কাছ থেকে ট্যাপেন্ডাডল ট্যাবলেটসহ এক চা দোকানিকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম জাকির হোসেন (৩৭)। তাঁর বাবার নাম শামীম শেখ। নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানার আদর্শগ্রাম এলাকার বাসিন্দা জাকির ডিসি অফিসের পাশেই একটি চায়ের দোকান পরিচালনা করতেন। অভিযোগ রয়েছে, চায়ের দোকানের আড়ালে তিনি ইয়াবা, ট্যাপেন্ডাডল ট্যাবলেট ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি করতেন।
গত ১ নভেম্বর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল অভিযান চালিয়ে তাঁর দোকান থেকে ৯০ পিস ট্যাপেন্ডাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করে। এ সময় জাকিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
ডিসি কার্যালয় থেকে জাকিরের দোকানটির দূরত্ব আনুমানিক ২০০ গজ। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দক্ষিণ পাশে সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের পশ্চিম দেয়ালঘেঁষে দোকানটির অবস্থান। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, পুলিশ ও প্রশাসনের কার্যালয়ের এত কাছে থেকেও জাকির দীর্ঘদিন ধরে মাদকের কারবার চালিয়ে আসছিলেন। এর আগেও তিনি মাদকসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ড্রেনজুড়ে ফেনসিডিলের খালি বোতল
সম্প্রতি সরেজমিনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের পশ্চিম পাশে টিনশেডের একতলা একটি ভবন রয়েছে। ভবনটিতে পাশাপাশি তিনটি দোকান। প্রথমটিতে স্ট্যাম্প বিক্রি করা হয়, মাঝের দোকানটি জাকির হোসেনের এবং শেষেরটিতে কয়েকজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত চেম্বার রয়েছে।
ভবনটির পাশের গলিতে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়সংলগ্ন আরেকটি চায়ের দোকান রয়েছে। দোকানটির মালিক দুলাল। এর পাশেই একটি ড্রেন। সেখানে পড়ে থাকতে দেখা গেছে ফেনসিডিলের অসংখ্য খালি বোতল।
দলিল লেখকদের অভিযোগ, এই এলাকায় দিন-রাত মাদক সেবন চলে। মাদকসেবীদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মতো। অফিসের ভেতর থেকে তাকালেই এসব কর্মকাণ্ড দেখা যায় বলে দাবি করেছেন তাঁদের কেউ কেউ।
বিশ্রামাগার থেকে দোকান, বাড়ছে অপরাধের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন দলিল লেখক জানান, টিনশেডের ভবনটি মূলত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বিশ্রামের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে থাকা কক্ষগুলো দোকান ও অন্যান্য কাজে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া হয় বলে তাঁদের দাবি। বর্তমানে এসব স্থানে দোকান ও ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালিত হচ্ছে।
তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। বিশেষ করে জাকিরের চায়ের দোকানকে ঘিরে মাদকের কারবার বিস্তৃত হয়েছিল। সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের ভেতরে এমন কর্মকাণ্ড চললেও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা পর্যাপ্ত ছিল না বলে মনে করেন তাঁরা।
একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, ডিসি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ভেতরে বা আশপাশে হওয়ায় জায়গাটিকে অনেকেই নিরাপদ মনে করতেন। এ কারণে মাদক কারবারিরা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে তাঁদের অভিযোগ।
তবে জাকির গ্রেপ্তার হওয়ার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের ভাষ্য, ওই এলাকায় এখনো কয়েকজন মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছেন। ফলে একজনকে গ্রেপ্তার করেই সমস্যার সমাধান হবে না; পুরো এলাকাকে নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।
জাকির কারাগারে, দোকান চালাচ্ছেন ভাতিজা
মাদকসহ গ্রেপ্তারের পর জাকির কারাগারে থাকলেও তাঁর চায়ের দোকানটি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে দোকানটি পরিচালনা করছেন তাঁর ভাতিজা মো. আশিক।
আশিক জানান, তাঁর চাচা জাকির কারাগারে থাকায় তিনি দোকানটি চালাচ্ছেন। জাকির ট্যাপেন্ডাডল ট্যাবলেটসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন বলেও তিনি স্বীকার করেন। আশিকের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকেই ভাড়া নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নকলনবিশ বলেন, ওই এলাকায় প্রায় সব ধরনের মাদক পাওয়া যায় বলে তাঁদের অভিযোগ। সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের পেছনে প্রকাশ্যেই ফেনসিডিল সেবন চলে। মাদক কিনতে বিভিন্ন সময় লোকজন সেখানে ভিড় করেন। কার্যালয়ের ভেতর থেকে এসব দৃশ্য দেখা গেলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে তাঁর দাবি।
তিনি বলেন, সরকারি অফিসের পরিবেশ ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সেখান থেকে চায়ের দোকান, স্ট্যাম্পের দোকান এবং ব্যক্তিগত চেম্বারগুলো সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, প্রশাসনিক স্থাপনার ভেতরে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সুযোগ থাকলে তা যথাযথ তদারকির আওতায় রাখা জরুরি।
অভিযোগ জানতেন না জেলা প্রশাসক
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভেতরে দোকান এবং মাদক কারবারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তাঁর দাবি, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কোনো দোকান ভাড়া দেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করার জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে পাঠানো হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্যের পর দোকানগুলো কীভাবে সেখানে পরিচালিত হচ্ছে এবং ভবনটির প্রকৃত ব্যবস্থাপনা কার হাতে, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রশাসনিক কার্যালয়ের নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা। এখানে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেবাপ্রত্যাশীদের যাতায়াত থাকে। এমন একটি স্থাপনার ভেতরে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগ শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ড্রেনে ফেনসিডিলের অসংখ্য খালি বোতল পড়ে থাকার অভিযোগ এবং মাদকসেবীদের প্রকাশ্য আনাগোনার বিষয়টি যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে দোকানগুলো কী প্রক্রিয়ায় সেখানে স্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর ভাড়া বা ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তদারকি করেছে কি না, সেসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন।
জাকিরের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সামনে এলেও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। তাই শুধু একজন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে মামলা নয়, পুরো এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান, নজরদারি এবং দোকানগুলোর বৈধতা যাচাই জরুরি। জেলা প্রশাসন সরেজমিন তদন্তের যে উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, এখন সেই উদ্যোগের বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।