গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বেতন বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ ১৬ দফা দাবিতে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেছেন চন্দ্রা এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের (ইউনিট-১) শ্রমিকরা। দাবি বাস্তবায়নে কারখানা কর্তৃপক্ষকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন তারা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়ে রোববার (৮ নভেম্বর) ও সোমবার (৯ নভেম্বর) দুই দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
রোববার সকালে যথারীতি কারখানায় প্রবেশ করে কাজে যোগ দেন শ্রমিকরা। তবে কিছুক্ষণ পরই উৎপাদন বন্ধ রেখে কর্মবিরতি শুরু করেন তারা। পরে কারখানার ভেতরের মাঠে জড়ো হয়ে বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় শ্রমিকদের মধ্যে আগের হামলার ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ পায়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে এপেক্স ফুটওয়্যারের প্রধান ফটক বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছিল। এ সময় বাইরে অবস্থান করা বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একটি অংশ কারখানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতির অবনতি হলে পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে।
শ্রমিকরা জানান, ছুটি শেষে কারখানা থেকে বের হওয়ার সময় প্রধান ফটকের সামনে বহিরাগতদের হামলার শিকার হন এপেক্স ফুটওয়্যারের কয়েকজন শ্রমিক। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনার পর শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে, ওই ঘটনায় দুজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে কারখানার ভেতরে উত্তেজনা আরও বাড়ে। যদিও নিহতের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। শ্রমিকদের অভিযোগ, হামলার পরও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কারখানা চালু রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তারা হামলায় আহত শ্রমিকদের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এর আগে কর্তৃপক্ষ টানা চার দিনের ছুটি ঘোষণা করেছিল। সেই ছুটি শেষে রোববার সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে কারখানায় এলেও উৎপাদনে অংশ নেননি। বরং আগের হামলার ঘটনায় বিচার দাবি এবং বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন।
এ সময় শ্রমিকরা নতুন করে ১৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এসব দাবি বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন তারা। শ্রমিকদের বক্তব্য, শুধু ছুটি ঘোষণা করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য অধিকার ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে। তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে উত্থাপিত দাবিগুলো নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোববার ও সোমবার দুই দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগ) বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শ্রমিকদের উত্থাপিত ১৬ দফা দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে কারখানার মালিকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। আলোচনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিতে এপেক্স ফুটওয়্যার কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন করেছেন। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে। বর্তমানে কারখানা এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন।
শ্রমিকদের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমার মধ্যে কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। বিশেষ করে আগের হামলার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ১৬ দফা দাবির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম কবে স্বাভাবিক হবে, সেটিও নির্ভর করছে কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের আলোচনার অগ্রগতির ওপর।