এদিকে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আশুলিয়ার ৭০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে একই সময়ে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা পর্যন্ত সেখানে নতুন করে কোনো শ্রমিক বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে আশুলিয়ার আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের আশপাশের বিভিন্ন কারখানায় কাজে যোগ দেন শ্রমিকেরা। তবে অনেকেই কাজ না করে কারখানার ভেতরে অবস্থান নেন। পরে কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলে সকাল সাড়ে আটটার দিকে জামগড়া এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন তাঁরা।
এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ইটপাটকেলে পুলিশের একটি গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সাভার ও আশুলিয়ার সার্বিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো। তবে কিছু এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা থাকায় কারখানা কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
তিনি জানান, আশুলিয়া ও সাভারের মোট ১ হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে ৭০টিতে বৃহস্পতিবার ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সকালে জামগড়া এলাকায় কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণার পর কিছু দুষ্কৃতকারী কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে কয়েকজনকে আটক করার পর পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এদিকে আশুলিয়ার দোসাইদ এলাকাতেও শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল থেকে ওই এলাকার বিভিন্ন কারখানায় স্বাভাবিকভাবে কাজ চলছিল। তবে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ফেব্রিকা নিট কম্পোজিট কারখানার সামনে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা কারখানাটির দুটি ফটক ভেঙে ফেলেন। এ পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ কারখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করে। পরে আশপাশের আরও কয়েকটি কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়।
শ্রমিক আন্দোলনে উসকানির অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩০
শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাভার ও আশুলিয়ায় সহিংসতা এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগে এ পর্যন্ত আটটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন।
তিনি জানান, আন্দোলনে উসকানি দেওয়া এবং সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পাঁচ দিনের অস্থিরতার পর স্বাভাবিক গাজীপুর
অন্যদিকে টানা পাঁচ দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের পর গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা পর্যন্ত জেলার কোথাও নতুন করে শ্রমিক আন্দোলন বা বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
শিল্পাঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। সম্ভাব্য নাশকতা ও সহিংসতা ঠেকাতে নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরের সফিপুরে আনসারের একটি প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক। তিনি জানান, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আনসারের থানা ও ওয়ার্ডভিত্তিক জনবল ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কারা নাশকতার পরিকল্পনা করছে এবং কোথায় কী ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে, তা জানার চেষ্টা চলছে। দুষ্কৃতকারীরা যাতে জানমালের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য আনসার ব্যাটালিয়ন কাজ করছে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে চলমান অসন্তোষের মধ্যে মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আশুলিয়ায় নতুন করে সংঘর্ষ এবং একাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণার ঘটনায় পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরাতে শ্রমিকদের দাবি, মালিকপক্ষের অবস্থান এবং সরকারের উদ্যোগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এখন জরুরি।