গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে হামলার শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তৌফিক শেখ (২২)। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে তার মরদেহ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নিজ গ্রামে পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয়জনকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকার পরিবেশ।
নিহত তৌফিক শেখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মৃত তবিবর রহমান তবির ছেলে। ছয়ঘরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৩ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। জীবিকার তাগিদে পড়াশোনার পাশাপাশি গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্বজনরা তার মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছান। কোচাশহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় ছয়ঘরিয়া গ্রামে তৌফিকের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার উত্তরার শিনশিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তৌফিকের মৃত্যু হয়। কয়েক দিন আগে গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে তিনি হামলার শিকার হন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের জীবিকা নির্বাহের তাগিদে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তৌফিক। এক বন্ধুর সহযোগিতায় গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। কাজের সুবাদে তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন।
সম্প্রতি মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন চলছিল। তৌফিকও ওই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজন ও এলাকাবাসী।
নিহতের বড় ভাই হারুন মিয়ার অভিযোগ, গত সোমবার আন্দোলন চলাকালে হামলার একটি ঘটনা মোবাইল ফোনে ধারণ করার চেষ্টা করেন তৌফিক। এ সময় হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে তাকে বেধড়ক মারধর করা হলে তিনি গুরুতর আহত হন।
পরে আন্দোলনরত অন্য শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার উত্তরার শিনশিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়।
ভাইকে হারিয়ে শোকাহত হারুন মিয়া এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে তরুণ বয়সে তৌফিকের এমন মৃত্যুতে ছয়ঘরিয়া গ্রামজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে তিনি ছিলেন পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া এক তরুণ। বাবাকে হারানোর পর নিজের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু কর্মস্থলের শহরে একটি সহিংস ঘটনার শিকার হয়ে তার জীবন থেমে গেল।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহফুজ মঙ্গলবার রাতে জানান, রাত ১০টার দিকে তৌফিকের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। বুধবার তার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে সহিংসতা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। একজন তরুণ শ্রমিকের এমন মৃত্যুতে তার পরিবার যেমন অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও আবার আলোচনায় এসেছে।