শ্রমিকদের উত্থাপিত বিভিন্ন দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব দাবি মজুরি বোর্ডে পর্যালোচনা করে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার থেকে সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে চলমান সংকট নিরসনে আয়োজিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন শ্রমমন্ত্রী।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো সরকারের নজরে এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব বিষয়ে মজুরি বোর্ডে আলোচনা হবে। আলোচনার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও মালিকপক্ষের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে সরকার শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা অল্প সময়ের নোটিশেও আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। একইভাবে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রতিনিধিরাও বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় সহযোগিতা করছেন। উভয় পক্ষের ইতিবাচক মনোভাবের কারণে কারখানাগুলো দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শ্রমমন্ত্রী বলেন, আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। তাই শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার থেকে শ্রমিকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে গাজীপুরে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকারের পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও পরিবারটির পাশে সরকার থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়েও নতুন উদ্যোগের কথা জানান আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, গাজীপুরের টঙ্গীতে শ্রমিকদের জন্য ১০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে অনুমোদিত সারসংক্ষেপ তার কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রক্রিয়াগত কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি শ্রমিকদের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন মন্ত্রী। তার ভাষ্য, নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও যেসব শ্রমিক কারাবরণ করেছেন, তাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে। তবে ভিডিও ফুটেজে যাদের বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মজুরি নির্ধারণের অগ্রগতি প্রসঙ্গে শ্রমমন্ত্রী জানান, শনিবার রাতে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পরদিন রোববার দুপুর ১২টার আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। একই দিন সন্ধ্যায় এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী চার দিনের মধ্যে মজুরি বোর্ডের পরবর্তী সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য দাবি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ক্ষেত্রে মজুরি বোর্ডের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চলমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সমাধানের জন্য শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে দাবি নিষ্পত্তির আশ্বাস এবং বৃহস্পতিবার থেকে কাজে ফেরার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। এখন মজুরি বোর্ডের পরবর্তী বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত আসে এবং শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কতটা অগ্রগতি হয়, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট সবার।