গোপালগঞ্জে ধানের জমিতে বৈদ্যুতিক মোটর দিয়ে সেচ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বাবা ও ছেলের মৃত্যু হয়েছে। সেচঘরে কাজ করার সময় বাবাকে বিদ্যুতায়িত হয়ে ছটফট করতে দেখে তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে যায় ১২ বছরের মেহেদী হাসান খাঁ। কিন্তু বাবাকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেও বিদ্যুতায়িত হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের চর বড়ফা গ্রামে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন চর বড়ফা গ্রামের এনায়েত খাঁ (৪০) ও তাঁর ছেলে মেহেদী হাসান খাঁ (১২)। মেহেদী স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুরে বিদ্যালয়ে তার বাংলা পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলে যাওয়ার বদলে বাবার সঙ্গে জমিতে গিয়ে আর বাড়ি ফিরতে পারেনি সে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে এনায়েত খাঁ নিজের ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য সেচঘরে যান। ধানের জমিতে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের কাজে বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করা হচ্ছিল। সেচ দেওয়ার কাজের একপর্যায়ে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। বিদ্যুতের সংস্পর্শে এসে তিনি ছটফট করতে থাকেন।
বাবার এমন অবস্থা দেখে মেহেদী তাঁকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করেই বাবাকে সরাতে যাওয়ায় সেও বিদ্যুতায়িত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই বাবা-ছেলে দুজন গুরুতর আহত হয়ে পড়েন।
পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করে দ্রুত গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক এ কে এম সিরাজুল ইসলাম দুপুরের দিকে এনায়েত খাঁ ও মেহেদী হাসানকে মৃত ঘোষণা করেন।
মাত্র ১২ বছর বয়সী মেহেদীর মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার স্বজনদের কাছে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—যে শিশুটির সেদিন পরীক্ষার হলে থাকার কথা ছিল, বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে তাকেই প্রাণ হারাতে হলো।
নিহত এনায়েত খাঁর ভাই নূর ইসলাম খাঁ বলেন, ‘আমার ভাতিজা মেহেদী হাসানের আজ বাংলা পরীক্ষা ছিল। বাবার সঙ্গে কাজে গিয়ে সে–ও মারা গেল।’
স্থানীয়ভাবে ধানের জমিতে সেচের জন্য বৈদ্যুতিক মোটর ও পাম্প ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্রে বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকায় সামান্য ত্রুটি, ভেজা পরিবেশ কিংবা অসতর্কতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে খালি হাতে স্পর্শ করলে উদ্ধার করতে যাওয়া ব্যক্তিও বিদ্যুতায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা জরুরি।
তবে এই দুর্ঘটনায় ঠিক কী কারণে এনায়েত খাঁ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছিলেন, বৈদ্যুতিক মোটর বা সংযোগে কোনো ত্রুটি ছিল কি না—তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
একটি পরিবারের জন্য বাবা ও সন্তানের একসঙ্গে মৃত্যু শুধু শোকের ঘটনা নয়, অপূরণীয় ক্ষতিও। মেহেদীর হাতে হয়তো সেদিন থাকার কথা ছিল পরীক্ষার খাতা-কলম; আর এনায়েত খাঁর ছিল নিজের জমির সেচের কাজ শেষ করে পরিবারের কাছে ফেরার পরিকল্পনা। একটি বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সেই স্বাভাবিক দিনের সব হিসাব বদলে দিল।