• বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম:

জমি ছিল নিজস্ব, তবুও ৭৩ মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

newsline24 / ১২ Time View
Update : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জমি ছিল নিজস্ব, তবুও ৭৩ মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন
জমি ছিল নিজস্ব, তবুও ৭৩ মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

আসামের মুসলিমসংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়ালপাড়া জেলার কৃষণাই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ৭৩টি বসতবাড়ি ভেঙে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) পাঁচটি রাজস্ব গ্রামজুড়ে চালানো এ অভিযানে বুলডোজার, জেসিবি ও এক্সকাভেটর ব্যবহার করা হয়। প্রশাসনের ভাষ্য, কৃষি জমিকে আবাসিক ব্যবহারের জন্য বৈধ অনুমোদন না নিয়েই এসব বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল।

উচ্ছেদ অভিযানটি পরিচালিত হয় খারিজা পাইকান, খামার মানিকপুর, ভোজমালা পার্ট-২, জটশারবাড়ি ও টেঙ্গাবাড়ি রাজস্ব গ্রামে। জেলা প্রশাসনের দাবি, এসব এলাকায় কৃষি জমির পাশাপাশি জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথও দখল বা সংকুচিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলে বর্ষাকালে পানি চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

গোয়ালপাড়ার জেলা কমিশনার প্রদীপ তিমুং বলেন, সংশ্লিষ্ট জমিগুলো মূলত কৃষিকাজের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু অনুমোদন ছাড়াই সেখানে দ্রুত আবাসন গড়ে উঠতে থাকে। তাঁর দাবি, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল এবং স্থানীয় জলাশয়গুলোর পরিসরও কমে আসছিল।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাটিয়া রাজস্ব সার্কেল অফিসারের মাধ্যমে বাসিন্দাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এলাকা খালি করে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো পরিবারই নিজেদের ঘর সরিয়ে নেয়নি। এরপরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়।

জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন

তবে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উচ্ছেদের শিকার পরিবারগুলো এবং স্থানীয় কয়েকটি সংখ্যালঘু সংগঠন। তাদের অভিযোগ, উচ্ছেদ হওয়া অনেক পরিবারের কাছেই জমির বৈধ মালিকানার কাগজপত্র রয়েছে। অর্থাৎ, তারা সরকারি জমি দখল করে বসতি গড়েনি; বরং নিজেদের মালিকানাধীন জমিতেই বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিল।

নর্থ ইস্ট মাইনোরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি নুরুল ইসলাম দাবি করেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে বৈধ দলিল রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মূল সমস্যা জমির মালিকানা নয়, বরং সরকারি নথিতে জমিগুলো কৃষি জমি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ থাকা।

তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি এ ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

মুসলিম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব আসামের সভাপতি আশিক রব্বানিও প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কৃষি জমিতে বাড়ি নির্মাণকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

সাম্প্রদায়িক অভিযোগ অস্বীকার প্রশাসনের

উচ্ছেদ অভিযানটি মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে—এমন অভিযোগ অবশ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন জেলা কমিশনার প্রদীপ তিমুং। তাঁর দাবি, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অভিযান নয়; বরং জমির ব্যবহার, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ।

তিমুং জানান, দরং, বরপেটা, ধুবড়ি ও মানকাচরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে ওই অঞ্চলে বসতি গড়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, উচ্ছেদের বিষয়টিকে হিন্দু-মুসলিম বা সংখ্যালঘু ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এমনকি স্থানীয় কিছু মুসলিম বাসিন্দাও কৃষিজমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

তবে জমির মালিকানা থাকা সত্ত্বেও বাড়িঘর ভেঙে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন, বসবাসের বৈধতা এবং উচ্ছেদের আগে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব বিষয় নিয়েই মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

আসামে সাম্প্রতিক সময়ে জমি, বনভূমি ও সরকারি সম্পদ দখলমুক্ত করার নামে একাধিক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরেও গোয়ালপাড়ার দহিকাটা এলাকায় বনভূমি দখলমুক্ত করতে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছিল জেলা প্রশাসন। ফলে কৃষিজমি ও বসতভিটা নিয়ে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category